সরকারি চাকরিতেই প্রচলিত সরকারি পেনশন, অন্য চাকরিতে সর্বজনীন পেনশন—২০২৬ সালে ব্যবস্থাটা কী?
বাংলাদেশে চাকরিজীবীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন রয়েছে—সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি চাকরিতেও কি পেনশন পাওয়া যায়?
২০২৬ সালের বর্তমান ব্যবস্থায় বিষয়টি বুঝতে হলে সরকারি চাকরির প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থা এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ পরিচালিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আলাদা করে দেখতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রয়েছে প্রচলিত সরকারি পেনশন
সরকারি বেসামরিক কর্মচারীদের অবসর-পরবর্তী সুবিধার জন্য সরকারের নিজস্ব পেনশন ব্যবস্থা রয়েছে। এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ‘সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০’। সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের রেফারেন্স তালিকাতেও এ আদেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই ব্যবস্থার আওতায় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মাসিক পেনশন, আনুতোষিকসহ সংশ্লিষ্ট অবসর সুবিধা পেয়ে থাকেন। পেনশন প্রক্রিয়ায় চাকরিকাল, অবসর/PRL-এর আদেশ, শেষ বেতন, চাকরির রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের কী হবে?
বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য সরকারি চাকরির একই ধরনের প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থা নেই। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বেসরকারি কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানকে ‘প্রগতি’ স্কিমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে স্বকর্মী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের জন্য রয়েছে ‘সুরক্ষা’ স্কিম।
অর্থাৎ বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মূল ধারণাটি হলো—চাঁদা জমা, সেই অর্থ বিনিয়োগ এবং নির্ধারিত বয়সে পেনশন গ্রহণ।
চার ধরনের সর্বজনীন পেনশন স্কিম
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় চারটি প্রধান স্কিম রয়েছে—
প্রবাস: প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য।
প্রগতি: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
সুরক্ষা: স্বকর্মী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের জন্য।
সমতা: স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রগতি স্কিমে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে পারে; আবার যোগ্য ব্যক্তি নিজ উদ্যোগেও এতে অংশ নিতে পারেন।
সরকারি চাকরিজীবীরা কি সর্বজনীন পেনশনে যোগ দিতে পারবেন?
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি, রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মচারীরা যারা প্রচলিত অবসর সুবিধার আওতায় রয়েছেন, তারা সাধারণভাবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশ নিতে পারেন না। কেউ সর্বজনীন পেনশনে থাকার পর পেনশনযোগ্য সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে তার আগের স্কিম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; নিয়ম অনুযায়ী জমাকৃত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা রয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি চাকরির প্রচলিত পেনশন এবং সর্বজনীন পেনশন—দুটি একই ব্যবস্থা নয়।
সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ
২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানির কর্মীরা সরকারের প্রচলিত পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরাসরি সরকারি সিভিল কর্মচারীর মতো রাষ্ট্রীয় পেনশন পান না; তাদের অবসর সুবিধা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরি বিধি ও ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য। কারণ সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মানেই সেখানে কর্মরত সবাই সরকারি পেনশনভোগী—এমন নয়।
ব্যাংক কর্মীদেরও সর্বজনীন পেনশনে আনার উদ্যোগ
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ও তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল।
এর ফলে বেসরকারি ও ব্যাংকিং খাতের কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আউটসোর্সিং কর্মীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা
২০২৬ সালে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নতুনভাবে ‘আউটসোর্সিং সেবাকর্মী’ শ্রেণি যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ‘প্রগতি’ স্কিমের বিশেষ ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে।
এর ফলে প্রচলিত সরকারি পেনশন ব্যবস্থার বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির কর্মীর জন্য সর্বজনীন পেনশনের আওতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
‘প্রত্যয়’ স্কিমের বিষয়টি কী?
স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার জন্য ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে ২০২৪ সালে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। তবে বর্তমানে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আইন ও বিধিমালার তালিকায় **‘প্রত্যয় স্কিম বাতিলের প্রজ্ঞাপন’**ও রয়েছে।
তাই পুরোনো ‘প্রত্যয়’ সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে ২০২৬ সালের বর্তমান পেনশন ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
সর্বজনীন পেনশনে কীভাবে পেনশন পাওয়া যায়?
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মূল কাঠামো হলো—নির্ধারিত স্কিমে নিবন্ধন করে নিয়মিত চাঁদা প্রদান করা, সেই অর্থ বিনিয়োগ করা এবং প্রযোজ্য বয়স ও শর্ত পূরণ হলে পেনশন পাওয়া।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পেনশনের অর্থ ব্যাংক হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চাঁদার হার পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট শর্তে স্কিম পরিবর্তনের সুযোগও রয়েছে।
সরকারি পেনশন বনাম সর্বজনীন পেনশন
সহজভাবে বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়—
| বিষয় | প্রচলিত সরকারি পেনশন | সর্বজনীন পেনশন |
|---|---|---|
| প্রধান লক্ষ্য | সরকারি কর্মচারীর অবসর সুবিধা | বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবসর নিরাপত্তা |
| প্রধান ভিত্তি | সরকারি চাকরি ও প্রযোজ্য পেনশন বিধান | চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা |
| সরকারি কর্মচারী | প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি পেনশন | সাধারণভাবে একই সময়ে নয় |
| বেসরকারি কর্মচারী | প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে পারে | ‘প্রগতি’ স্কিম |
| স্বকর্মী | প্রচলিত সরকারি পেনশন নয় | ‘সুরক্ষা’ স্কিম |
| প্রবাসী | প্রচলিত সরকারি পেনশন নয় | ‘প্রবাস’ স্কিম |
| স্বল্প আয়ের ব্যক্তি | — | ‘সমতা’ স্কিম |
সর্বশেষ পরিস্থিতি
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধনকারী ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩২৭ জন। একই তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ট্রেজারি বন্ডে সর্বমোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সর্বশেষ উদ্যোগে প্রচলিত সরকারি পেনশনের বাইরে থাকা সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
শেষ কথা
বাংলাদেশের বর্তমান পেনশন কাঠামোকে মোটামুটি দুটি বড় ধারায় দেখা যায়—সরকারি চাকরির প্রচলিত সরকারি পেনশন ব্যবস্থা এবং সরকারি পেনশনের আওতার বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা।
তবে ‘শুধু সরকারি চাকরিজীবীরাই পেনশন পান’—এমন সরলীকরণ পুরোপুরি সঠিক নয়। কিছু বেসরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অবসর সুবিধা থাকতে পারে। মূল পার্থক্য হলো, সরকারি বেসামরিক কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সরকারি পেনশন ব্যবস্থা রয়েছে, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য চাঁদাভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
২০২৬ সালে এই ব্যবস্থার আওতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে—বিশেষ করে বেসরকারি কর্মী, ব্যাংক কর্মী, আউটসোর্সিং কর্মী এবং সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে, যারা প্রচলিত সরকারি পেনশনের আওতায় নেই।


Hi, this is a comment.
To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
Commenter avatars come from Gravatar.