জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের নিয়ম ২০২৬: কোন তথ্য বদলাতে কী লাগবে, কেন অনেকের আবেদন আটকে যায়
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি বর্তমানে নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। ব্যাংক হিসাব, পাসপোর্ট, চাকরি, সিম নিবন্ধন, ভূমি ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সেবায় এনআইডির তথ্য ব্যবহৃত হওয়ায় নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম কিংবা ঠিকানায় ভুল থাকলে পরবর্তীতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এনআইডি সংশোধন মানেই যে সব ক্ষেত্রে কঠিন বা দীর্ঘ প্রক্রিয়া—বিষয়টি এমন নয়। সংশোধনের ধরন, পরিবর্তনের মাত্রা এবং আবেদনকারীর দাখিল করা প্রমাণপত্রের সঙ্গে বিদ্যমান তথ্যের সামঞ্জস্যের ওপর প্রক্রিয়াটি অনেকটাই নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি উইংয়ের প্রকাশিত নিয়মে বিভিন্ন ধরনের সংশোধনের জন্য আলাদা দলিল ও যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
অনলাইনে এনআইডি সংশোধনের সুযোগ
বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের জন্য অনলাইন সেবা ব্যবস্থাও রয়েছে। আবেদনকারী নিজের প্রোফাইলে থাকা তথ্য যাচাই করে সংশোধনের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল দাখিল করতে পারেন। সাম্প্রতিক প্রকাশিত নির্দেশনাগুলোতেও অনলাইন প্রোফাইল থেকে তথ্য সংশোধনের আবেদন করার ধাপ দেখানো হয়েছে।
তবে অনলাইনে আবেদন করলেই সংশোধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায় না। আবেদনে যে পরিবর্তন চাওয়া হয়েছে, সেটির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র বা যাচাই চাইতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মেও supporting document বা সহায়ক দলিল দাখিলের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
নিজের নাম সংশোধনে কী লাগতে পারে
নিজের নামের বানান বা নামের পরিবর্তনের বিষয়টি অন্যান্য সাধারণ সংশোধনের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, ডাকনাম বা অন্য নামে নিবন্ধিত তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের সনদ, বিবাহিত হলে স্বামী/স্ত্রীর এনআইডির কপি, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সম্পাদিত এফিডেভিট এবং জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের কপি প্রয়োজন হতে পারে। এরপর মূল কাগজপত্রসহ ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু আবেদন করলেই বড় ধরনের নাম পরিবর্তন হয়ে যাবে—এমন নয়।
পিতা বা মাতার নামের ভুল সংশোধন
পিতা, মাতা কিংবা স্বামী/স্ত্রীর নামের ক্ষেত্রে সাধারণত একাধিক প্রমাণপত্রের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের সংশোধনে এসএসসি/সমমানের সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মসনদ, চাকরির প্রমাণপত্র, পাসপোর্ট, নিকাহনামা এবং সংশ্লিষ্ট পিতা, মাতা বা স্বামী/স্ত্রীর এনআইডির কপি—প্রয়োজন অনুযায়ী দাখিল করা যেতে পারে।
পিতা-মাতার নাম আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদ বা রেজিস্ট্রেশন কার্ড, পিতা-মাতার এনআইডি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র দিতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজনও হতে পারে।
জন্মতারিখ সংশোধন সবচেয়ে বেশি সতর্কতার বিষয়
এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারী কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি বা সমমান পাস করা ব্যক্তির জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার সনদ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বয়সের পরিবর্তন অস্বাভাবিক না হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু বড় বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মূল সনদ দেখানো অথবা ব্যক্তিগত শুনানির প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে এসএসসি বা সমমানের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে সার্ভিস বুক/এমপিওর কপি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্মসনদ, নিকাহনামা, পাসপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট পুরোনো প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার ও মাঠপর্যায়ে তদন্তও হতে পারে।
তাই জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি
এনআইডিতে থাকা বয়সের সঙ্গে নিজের পছন্দের বয়স মিলিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যে বয়স সঠিক, সেটি প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য দলিল দিতে হয়।
বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে তথ্য পরিবর্তন
বিয়ের পর স্বামীর নাম যুক্ত করতে চাইলে কাবিননামা ও স্বামীর এনআইডির কপি প্রয়োজন হতে পারে।
আবার বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামীর নাম বাদ দিতে চাইলে তালাকনামার সত্যায়িত কপি দাখিলের বিধান রয়েছে।
এখানে সংশোধনের কারণ এবং দাখিল করা দলিলের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঠিকানা সংশোধন ও ভোটার এলাকা পরিবর্তন এক নয়
অনেকেই ঠিকানা সংশোধন এবং ভোটার এলাকা পরিবর্তনকে একই বিষয় মনে করেন। বাস্তবে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট ফরমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে আবেদন করতে হয়। অন্যদিকে একই ভোটার এলাকার মধ্যে ঠিকানার নম্বর বা বানানের ভুল সংশোধনের জন্য পরিবারের সদস্যের এনআইডি, গ্যাস/বিদ্যুৎ/টেলিফোন বিল, কর পরিশোধের কাগজ কিংবা চেয়ারম্যান/ওয়ার্ড কমিশনারের প্রত্যয়নপত্রের মতো দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ফরম তালিকায় ফরম-১৩ ও ফরম-১৪সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফরম প্রকাশিত রয়েছে।
রক্তের গ্রুপ সংশোধন তুলনামূলক সহজ
এনআইডিতে রক্তের গ্রুপ ভুল থাকলে বা নতুন করে যুক্ত করতে চাইলে মেডিকেল রিপোর্ট দাখিল করার বিধান রয়েছে।
তবে রিপোর্টে উল্লেখিত রক্তের গ্রুপ এবং আবেদন করা তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
এনআইডির ভুল সংশোধনে ফি সব ক্ষেত্রে একই নয়
এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি প্রযোজ্য হতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করা না হয়ে থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশোধনের জন্য ফি না-ও লাগতে পারে।
তাই শুধু অন্যের কাছ থেকে ফি জেনে আবেদন না করে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য ফি যাচাই করা উচিত।
কেন এনআইডি সংশোধনের আবেদন আটকে যায়?
এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা সাধারণত দেখা দেয় যখন বিভিন্ন সরকারি নথিতে আলাদা আলাদা তথ্য থাকে।
যেমন—
- এনআইডিতে এক বানানের নাম;
- জন্মনিবন্ধনে অন্য বানান;
- এসএসসি সনদে আরেক বানান;
- পাসপোর্টে ভিন্ন তথ্য;
- পিতা বা মাতার এনআইডিতে আবার অন্য নাম।
এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশোধনকারী কর্তৃপক্ষকে নির্ধারণ করতে হয় কোন তথ্যটি সঠিক এবং তার পক্ষে কোন প্রমাণপত্র সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সংশোধনের ক্ষেত্রে সহায়ক দলিল দাখিল করতে হবে এবং এসএসসি বা সমমানের সনদ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিবাহ/বিবাহবিচ্ছেদের দলিল, এফিডেভিট, সার্ভিস বুকসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করা হতে পারে।
ব্যক্তিগত শুনানি বা তদন্ত হতে পারে
সব আবেদন একইভাবে নিষ্পত্তি হয় না। সাধারণ বানান সংশোধনের সঙ্গে বড় ধরনের নাম পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক জন্মতারিখ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এক নয়।
কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হতে হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে।
২০২৩ সালের একটি নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত প্রকাশিত নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে, সংশোধনের ধরন অনুযায়ী দাখিল করা দলিল, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত দলিল চাওয়া যেতে পারে।
আবেদন করার আগে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি
এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার আগে প্রথমে নিজের সব গুরুত্বপূর্ণ নথি মিলিয়ে দেখা উচিত।
বিশেষ করে—
১. এনআইডি
২. জন্মনিবন্ধন
৩. এসএসসি/সমমানের সনদ
৪. পাসপোর্ট থাকলে পাসপোর্ট
৫. পিতা-মাতার এনআইডি
৬. বিবাহিত হলে কাবিননামা
৭. প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সরকারি নথি
এর মধ্যে কোন নথিতে সঠিক তথ্য আছে এবং কোন নথিতে ভুল আছে—তা আগে নির্ধারণ করা উচিত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ভুল তথ্য সংশোধনের নামে মিথ্যা, জাল বা অসত্য কাগজপত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এনআইডি সংশোধন একটি সরকারি পরিচয়-তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করতে পারে।
তাহলে এনআইডি সংশোধন কি সত্যিই খুব জটিল?
সব ক্ষেত্রে নয়।
যদি আবেদনকারীর চাওয়া সংশোধনটি বাস্তব ভুল হয় এবং সেটির পক্ষে শক্তিশালী ও পরস্পর-সামঞ্জস্যপূর্ণ সরকারি দলিল থাকে, তাহলে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সরল হতে পারে। কিন্তু নাম আমূল পরিবর্তন, জন্মতারিখে বড় পরিবর্তন, পিতা-মাতার পরিচয়ে বড় পরিবর্তন কিংবা একাধিক নথিতে পরস্পরবিরোধী তথ্য থাকলে যাচাই-বাছাই ও শুনানির কারণে সময় ও প্রক্রিয়া দুটোই বাড়তে পারে।
সুতরাং ২০২৬ সালে এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক তথ্য, সঠিক দলিল এবং সংশোধনের কারণের সঙ্গে দলিলের সামঞ্জস্য।
শেষ কথা
জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল থাকার বিষয়টি ছোট মনে হলেও ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, ব্যাংকিং, চাকরি, জমি-জমা কিংবা অন্যান্য সরকারি সেবায় তা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ভুল ধরা পড়লে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে নিয়ম অনুযায়ী সংশোধনের আবেদন করা নিরাপদ।
আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে “কোনো দালাল টাকা দিলেই কাজ করে দেবে” ধরনের কথায় বিশ্বাস না করে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সেবা ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের মাধ্যমেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এনআইডি সংশোধনের নিয়ম, প্রয়োজনীয় ফরম এবং সংশ্লিষ্ট সেবার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

