৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি এবং পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চতর পদ বা গ্রেডে পদোন্নতি পেলে তাঁর মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর পদের পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তাবলি অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী উচ্চতর পদে ও বেতন স্কেলে পদোন্নতি পেলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম চাকরিকাল পূরণ করতে হবে। ফলে পদোন্নতি পেলেই সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
বিশেষ করে যাঁরা তুলনামূলক কম চাকরিকালে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পাবেন, তাঁদের বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
৯ম পে-স্কেলে গ্রেডভিত্তিক পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য কত বছর চাকরি করতে হবে?
প্রকাশিত শর্তাবলির সারণিতে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রথম সাতটি গ্রেডের জন্য পূর্ণ বেতন পাওয়ার ন্যূনতম চাকরিকাল উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেডভিত্তিক সময়সীমা হলো—
| গ্রেড | বেতন স্কেল | ন্যূনতম চাকরিকাল |
|---|---|---|
| ১ম গ্রেড | ১,৫৬,০০০ টাকা (নির্ধারিত) | ২০ বছর |
| ২য় গ্রেড | ১,৩২,০০০–১,৫৩,০০০ টাকা | ১৭ বছর |
| ৩য় গ্রেড | ১,১৩,০০০–১,৪৮,৮০০ টাকা | ১৪ বছর |
| ৪র্থ গ্রেড | ১,০০,০০০–১,৪২,৪০০ টাকা | ১২ বছর |
| ৫ম গ্রেড | ৮৬,০০০–১,৩৯,৭০০ টাকা | ১০ বছর |
| ৬ষ্ঠ গ্রেড | ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা | ৫ বছর |
| ৭ম গ্রেড | ৫৮,০০০–১,২৬,৮০০ টাকা | ৪ বছর |
এই সারণি অনুযায়ী, ৬ষ্ঠ গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য ন্যূনতম পাঁচ বছর এবং ৭ম গ্রেডের জন্য চার বছরের চাকরিকাল প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চাকরিকাল ২০ বছর।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যেক গ্রেডের জন্য পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা এক নয়। গ্রেড যত উচ্চতর, নির্ধারিত চাকরিকালের প্রয়োজনীয়তাও তত বেশি।
নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি পেলে কী হবে?
সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই কেউ উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলে তাঁর বেতন কত হবে?
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে তিন বছর চাকরি করার পর ৬ষ্ঠ গ্রেডের একটি পদে পদোন্নতি পেলেন। কিন্তু ৬ষ্ঠ গ্রেডের পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজন পাঁচ বছরের চাকরিকাল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ওই কর্মচারী কি পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ৬ষ্ঠ গ্রেডের সর্বোচ্চ বা পূর্ণ বেতন পাবেন? নাকি তাঁর পূর্ববর্তী মূল বেতন বিবেচনা করে নতুন গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা হবে?
এ ছাড়া নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন কোন ধাপে থাকবে, পরবর্তী ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে এবং পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বেতন কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
চাকরিকাল কম হলে কি আনুপাতিক হারে বেতন নির্ধারণ হবে?
এ বিষয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর চাকরি করলে কি পাঁচ বছরের তিন-পঞ্চমাংশ হিসাবে বেতন নির্ধারণ করা হবে?
বাস্তবে শুধু চাকরিকালের অনুপাত দিয়ে মূল বেতন নির্ধারণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কারণ সরকারি বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বেতন স্কেল, বেতন ধাপ, পদোন্নতির তারিখ এবং প্রযোজ্য পে-ফিক্সেশন বিধান বিবেচনা করতে হয়।
অর্থাৎ পাঁচ বছরের শর্ত থাকলে তিন বছর চাকরির জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রেডের বেতনের ৬০ শতাংশ দেওয়া হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত কেবল সারণির তথ্য থেকে নেওয়া সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে পদোন্নতির পর মূল বেতন নির্ধারণের নিয়ম এবং পূর্ণ বেতন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাকরিকালের শর্ত আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
চাকরিকাল গণনায় কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
প্রকাশিত বিধানের উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এ চাকরিকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপ-অনুচ্ছেদ (১)-এ বর্ণিত চাকরিকাল বলতে কেবল ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে নিয়োজিত প্রকৃত চাকরির মেয়াদ বোঝাবে।
এর অর্থ, কোনো কর্মচারীর মোট সরকারি চাকরির বয়স এবং এই বিধানের আওতায় গণনাযোগ্য চাকরিকাল এক বিষয় নয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো কর্মচারীর মোট সরকারি চাকরির বয়স ১৫ বছর হলেও তাঁর ৯ম বা তদূর্ধ্ব গ্রেডে প্রকৃত চাকরির মেয়াদ কত বছর, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তাই চাকরিকাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু যোগদানের তারিখ বা মোট চাকরির বয়স বিবেচনা করলেই হবে না; কোন গ্রেডে কত দিন প্রকৃত চাকরি করেছেন, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী পদোন্নতি পাওয়া কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
১. নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলে নতুন মূল বেতন কোন নিয়মে নির্ধারিত হবে?
২. পদোন্নতির সময় পূর্ববর্তী গ্রেডের মূল বেতন এবং নতুন গ্রেডের বেতন স্কেলের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে?
৩. নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবছরের ইনক্রিমেন্ট কীভাবে কার্যকর হবে?
৪. প্রয়োজনীয় চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী কীভাবে পূর্ণ বেতনের যোগ্যতা অর্জন করবেন?
৫. একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এবং সরাসরি উচ্চতর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরিকাল গণনার নিয়ম কি একই হবে?
৬. আইবাস++ পে-ফিক্সেশন সফটওয়্যারে এ ধরনের পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা থাকবে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের বেতন নির্ধারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
অর্থ বিভাগ ও হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা কেন জরুরি?
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় শুধু গ্রেডভিত্তিক বেতন স্কেল প্রকাশ করলেই সব জটিলতার সমাধান হয় না। পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, চাকরিকাল গণনা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির শর্তগুলো বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাঁরা নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাবেন, তাঁদের বেতন নির্ধারণের জন্য উদাহরণসহ একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হলে বিভ্রান্তি অনেকটাই কমবে।
অর্থ বিভাগ, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা বা পরিপত্র প্রকাশ করা হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিষয়টি আরও সহজ হবে।
শেষ কথা
৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এ পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির জন্য গ্রেডভিত্তিক ন্যূনতম চাকরিকাল নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই পদোন্নতি পাওয়া কর্মচারীদের মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে মনে রাখতে হবে, পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা এবং পদোন্নতির পর মূল বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি দুটি পৃথক বিষয়। তাই অনুমাননির্ভর হিসাব না করে সংশ্লিষ্ট আদেশের বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত বিধান এবং অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুসরণ করাই যুক্তিযুক্ত।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা হবে, যাতে নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের প্রাপ্য বেতন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।




