জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বকেয়া বেতন ও সমন্বয় বিল প্রস্তুতের কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে ‘বকেয়া বিল অটোমেশন’ নামের একটি ওয়েবভিত্তিক টুল। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময়ের প্রাপ্য বেতন, ইতিমধ্যে গৃহীত বেতন, সম্ভাব্য কর্তন এবং নীট বকেয়ার হিসাব এক জায়গায় প্রস্তুত করা যায়। একই সঙ্গে বকেয়া হিসাবের স্মারক, বিস্তারিত বিবরণী এবং টি.আর. ফরম-১৫-এর প্রিন্টযোগ্য খসড়া তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে।
টুলটির মূল লক্ষ্য হলো বকেয়া হিসাব প্রস্তুতের সময় বারবার হাতে গণনা করা এবং একই তথ্য একাধিক নথিতে লেখার প্রয়োজন কমানো। তবে এটি কোনো সরকারি পে-ফিকেশন ব্যবস্থা নয়। এখানে হিসাব তৈরি করা গেলেও বিল অনুমোদন বা বকেয়া অর্থ পরিশোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় না।
বকেয়া বিল তৈরির পুরো প্রক্রিয়া এক জায়গায়
সাধারণত বকেয়া বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর পরিচিতি, বেতনের তথ্য, প্রাপ্য সময়কাল, পূর্বে গৃহীত অর্থ এবং বিভিন্ন কর্তনের হিসাব প্রয়োজন হয়। এসব তথ্য একত্র করে নির্ভুল বিবরণী তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
‘বকেয়া বিল অটোমেশন’ টুলটিতে এই কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে চারটি প্রধান ধাপ রয়েছে—তথ্য ইনপুট, বকেয়া হিসাব, বকেয়া বিবরণী এবং টি.আর. ফরম-১৫।
প্রথম ধাপে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পর সফটওয়্যারটি হিসাব তৈরি করে। এরপর ব্যবহারকারী মোট বকেয়া, বিভিন্ন কর্তন এবং নীট প্রাপ্য অর্থের সারসংক্ষেপ দেখতে পারেন। একই তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত বিবরণী ও নির্ধারিত ফরমের খসড়া তৈরি করা যায়।
ফলে হিসাব প্রস্তুতের বিভিন্ন ধাপ একই ব্যবস্থার মধ্যে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কর্মচারীর যেসব তথ্য দিতে হবে
বকেয়া বিল প্রস্তুতের জন্য টুলটিতে কর্মচারীর নাম, পদবি, ২০২৬ সালের গ্রেড, প্রতিষ্ঠানের নাম এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট অফিসের নাম, কর্মস্থল, বিলের মাস, স্মারক নম্বর, স্মারকের তারিখ এবং বিলের বিষয়বস্তু ইনপুট দেওয়া যায়।
টি.আর. ফরম-১৫-এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড, ভাউচার নম্বর, টোকেন নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট তারিখ দেওয়ার আলাদা ঘর রয়েছে।
এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে হিসাবের বিভিন্ন নথিতে কর্মচারীর পরিচিতি ও অফিসসংক্রান্ত বিবরণ বসানো হয়। ব্যবহারকারী চাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি বিষয়বস্তুও পরিবর্তন করতে পারেন।
নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্য থেকে হিসাব
বকেয়া হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্দিষ্ট সময়ে কর্মচারীর প্রাপ্য অর্থ এবং ইতিমধ্যে গ্রহণ করা অর্থের পার্থক্য নির্ধারণ।
টুলটিতে নতুন স্কেলে প্রাপ্য মাসিক মূল বেতন এবং পুরোনো স্কেলে গ্রহণ করা মাসিক মূল বেতনের জন্য আলাদা ইনপুট রাখা হয়েছে। এই দুই অঙ্কের ভিত্তিতে সফটওয়্যারটি নির্ধারিত সময়ের মোট প্রাপ্য বেতন, মোট গৃহীত বেতন এবং উভয়ের পার্থক্য হিসাব করে।
হিসাবের সাধারণ কাঠামো হলো—
মোট বকেয়া = মোট প্রাপ্য বেতন − মোট গৃহীত বেতন।
এরপর প্রযোজ্য হিসেবে ইনপুট দেওয়া বিশেষ সুবিধা কর্তন এবং অতিরিক্ত গৃহীত বাড়িভাড়ার কর্তন হিসাব করা হয়।
নীট প্রাপ্য বকেয়া = মোট বকেয়া − মোট কর্তন।
এখানে বিশেষ সুবিধা কর্তনের হার এবং অতিরিক্ত বাড়িভাড়ার মাসিক অঙ্ক ব্যবহারকারীকে দিতে হয়। তাই সঠিক হিসাব পেতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রকৃত বেতন-ভাতার তথ্য এবং প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
মাসভিত্তিক হিসাবের সুবিধা
বকেয়া বিল তৈরির সময় সব মাসের বেতন এক রকম নাও হতে পারে। কোনো মাসে প্রাপ্য বেতন পরিবর্তিত হলে বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আলাদা হিসাব প্রয়োজন হলে সাধারণ হিসাবের পাশাপাশি মাসভিত্তিক তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে টুলটিতে শুরুর মাস ও শেষের মাস নির্বাচন করে একসঙ্গে একাধিক মাসের হিসাবের সারি তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চাইলে প্রতিটি সারিতে নির্দিষ্ট সময়ের শুরু ও শেষের তারিখও দেওয়া যায়।
কোনো মাসের প্রাপ্য বা গৃহীত বেতনের পরিমাণ আলাদা হলে সেই মাসের জন্য পৃথক অঙ্ক ইনপুট দেওয়া সম্ভব। অন্যথায় সফটওয়্যারটি সাধারণ ইনপুটে দেওয়া মাসিক বেতনের পরিমাণ ব্যবহার করে।
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সারি যোগ করা এবং ভুল বা অপ্রয়োজনীয় সারি মুছে ফেলার সুবিধা রয়েছে।
তবে আংশিক মাসের হিসাবের ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের ব্যবহৃত গণনাপদ্ধতি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেতন নির্ধারণের নিয়মের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
বকেয়া বিবরণীতে থাকবে কোন কোন তথ্য
টুলটি শুধু মোট বকেয়ার অঙ্ক দেখায় না; বরং মাসভিত্তিক হিসাবের বিস্তারিত বিবরণী তৈরির ব্যবস্থাও রেখেছে।
এই বিবরণীতে কর্মচারীর নাম, পদবি, গ্রেড, পুরোনো ও নতুন মূল বেতন, মাসিক বেতনের পার্থক্য এবং নির্ধারিত সময়ের মোট বকেয়া দেখানো হয়।
পাশাপাশি বিশেষ সুবিধা কর্তন, অতিরিক্ত গৃহীত বাড়িভাড়া কর্তন এবং সব কর্তন বাদ দেওয়ার পর নীট প্রাপ্য অর্থও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়।
বিবরণীর শেষে মোট হিসাব এবং কথায় টাকার পরিমাণ লেখার সুবিধা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা হিসাব প্রস্তুতকারী ব্যক্তি মাসভিত্তিক অঙ্কের সঙ্গে চূড়ান্ত হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারবেন।
এ ধরনের বিবরণী হিসাব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
টি.আর. ফরম-১৫-এর খসড়া তৈরি
বকেয়া হিসাবের পাশাপাশি টুলটিতে টি.আর. ফরম-১৫-এর একটি প্রিন্টযোগ্য খসড়া তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে।
এতে অফিসের নাম, বিলের মাস, কর্মচারীর পরিচিতি, প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড, টোকেন নম্বর, ভাউচার নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট তারিখ বসানো যায়।
ফরমের কাঠামোয় বেতন ও ভাতার খাত এবং বিভিন্ন কর্তনসংক্রান্ত অর্থনৈতিক কোডের তালিকা রাখা হয়েছে। স্ট্যাম্প ডিউটির জন্যও আলাদা ইনপুট রয়েছে।
ব্যবহারকারী ব্রাউজারের প্রিন্ট সুবিধার মাধ্যমে ফরমটি কাগজে ছাপাতে বা পিডিএফ হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারেন। বকেয়া হিসাবের অন্যান্য নথিও প্রিন্ট করার উপযোগী বিন্যাসে তৈরি করা হয়।
তবে ফরমে ব্যবহৃত অর্থনৈতিক কোড, হিসাবের খাত এবং কর্তনের বিবরণ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনার সঙ্গে যাচাই করতে হবে। সফটওয়্যারে কোনো খাত অন্তর্ভুক্ত থাকলেই সেটি সব ধরনের বকেয়া বিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, এমন নয়।
নমুনা হিসাবকে প্রকৃত বেতন মনে করার সুযোগ নেই
টুলটির প্রাথমিক সেটিংসে কিছু উদাহরণভিত্তিক তথ্য দেওয়া রয়েছে। সেখানে নতুন স্কেলে মাসিক মূল বেতন ২৪ হাজার টাকা, পুরোনো স্কেলে গৃহীত মূল বেতন ১৮ হাজার ৮৬০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তনের হার ১৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত বাড়িভাড়া কর্তন মাসে ৩৬০ টাকা দেখানো হয়েছে।
প্রাথমিক সময়কাল হিসেবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তিন মাসও রাখা হয়েছে।
এগুলো কেবল সফটওয়্যারের উদাহরণ। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সব সরকারি কর্মচারীর বেতন বা কর্তনের হার এমন হবে—এমন সিদ্ধান্ত এই তথ্য থেকে নেওয়া যায় না।
প্রকৃত বকেয়া হিসাব তৈরির আগে নমুনা তথ্য পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অনুমোদিত বেতন, প্রকৃত গৃহীত অর্থ এবং প্রযোজ্য কর্তনের তথ্য দিতে হবে।
তথ্য সংরক্ষণ ও প্রিন্টের সুবিধা
টুলটিতে ব্রাউজারের স্থানীয় স্টোরেজে ইনপুট দেওয়া তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। একই ব্রাউজারে পরে পেজটি খুললে আগের তথ্য পুনরুদ্ধার হতে পারে।
তবে এই সুবিধা সরকারি সার্ভারে তথ্য জমা হওয়া বা অনলাইনে বিল দাখিল হওয়ার সমতুল্য নয়। ব্রাউজারের তথ্য মুছে গেলে বা অন্য ডিভাইসে কাজ করলে আগের তথ্য পাওয়া নাও যেতে পারে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ হিসাব তৈরি করার পর প্রিন্ট বা পিডিএফ হিসেবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা ব্যাকআপ রাখা ভালো।
এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও ডিভাইসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিল জমা দেওয়ার আগে যেসব বিষয় যাচাই করতে হবে
বকেয়া বিলের হিসাব প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে প্রথমেই কর্মচারীর নতুন ও পুরোনো মূল বেতন সঠিক কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর বকেয়া দাবির সময়কাল, মাসভিত্তিক বেতনের পরিমাণ এবং আংশিক মাসের হিসাব পরীক্ষা করতে হবে।
বিশেষ সুবিধা কর্তন, বাড়িভাড়া সমন্বয় এবং অন্যান্য প্রযোজ্য কর্তনের অঙ্কও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
সবশেষে তৈরি হওয়া বিবরণীর মোট বকেয়া, মোট কর্তন ও নীট প্রাপ্য অর্থ মূল বেতন রেকর্ড এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
বিশেষ করে কোনো কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ বা প্রাপ্যতার বিষয়ে সরকারি আদেশের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হলে শুধু সফটওয়্যারের গণনার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
অটোমেশন টুলটি কী করতে পারে, আর কী পারে না
এই ওয়েবভিত্তিক টুলের প্রধান কাজ হলো ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বকেয়া হিসাব করা, বিভিন্ন কর্তনের অঙ্ক নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় নথির খসড়া তৈরি করা।
কিন্তু এতে সরকারি পে-ফিকেশন সিস্টেমে সরাসরি সংযোগ, সরকারি দপ্তরে অনলাইনে বিল জমা দেওয়া কিংবা বকেয়া অর্থ পরিশোধের কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দেখানো হয়নি।
অর্থাৎ, এটি হিসাব প্রস্তুতের কাজ সহজ করতে পারে; কিন্তু সরকারি অনুমোদন, হিসাব যাচাই এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়।
শেষ কথা
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-সংক্রান্ত বকেয়া বেতন ও সমন্বয় বিলের হিসাব প্রস্তুতের জন্য ‘বকেয়া বিল অটোমেশন’ টুলটিতে বেশ কয়েকটি ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে। একই জায়গায় কর্মচারীর তথ্য সংরক্ষণ, মাসভিত্তিক বকেয়া হিসাব, কর্তন নির্ধারণ, বিস্তারিত বিবরণী এবং টি.আর. ফরম-১৫-এর খসড়া তৈরির সুযোগ থাকায় হিসাব প্রস্তুতের কাজ সহজ হতে পারে।
তবে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে সঠিক তথ্য ইনপুট, গণনাপদ্ধতির যথার্থতা এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী যাচাইয়ের ওপর। তাই তৈরি করা হিসাবকে প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার পরই দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা উচিত।




