বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী গ্রাম পুলিশ বাহিনীর পদবিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘দফাদার’ ও ‘মহল্লাদার’ নাম দুটি পরিবর্তন করে নতুন পদবি নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন থেকে দফাদাররা ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’ এবং মহল্লাদাররা ‘গ্রাম পুলিশ’ হিসেবে পরিচিত হবেন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে।
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত গেজেটে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। নতুন এ বিধান অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারি বিধিমালা ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পরিচিতির ক্ষেত্রে নতুন নাম ব্যবহার করতে হবে।
সরকারি গেজেটে যে দুটি পদবির পরিবর্তন আনা হয়েছে
প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর পদবিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা হয়েছে। পরিবর্তনগুলো হলো—
- দফাদার থেকে গ্রাম পুলিশ প্রধান: এতদিন গ্রাম পুলিশ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরা দফাদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, এখন থেকে তাঁদের পদবি হবে গ্রাম পুলিশ প্রধান।
- মহল্লাদার থেকে গ্রাম পুলিশ: আগে বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের মহল্লাদার বলা হতো। নতুন বিধান অনুযায়ী, তাঁদের পরিচয় হবে গ্রাম পুলিশ।
অর্থাৎ, গ্রাম পুলিশ বাহিনীর প্রচলিত দুটি পদবির পরিবর্তে এখন থেকে নতুন দুটি পরিভাষা সরকারি বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কোন বিধিমালায় সংশোধনী আনা হয়েছে?
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৯৬ ধারা এবং ৪৮ ধারার সঙ্গে পঠিতব্য বিধানের ক্ষমতাবলে সরকার গ্রাম পুলিশ বাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলি-সংক্রান্ত বিধিমালা, ২০১৫-এর সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো সংশোধন করেছে।
সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, উল্লিখিত বিধিমালায় সর্বত্র ‘দফাদার’ শব্দের পরিবর্তে ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’ এবং ‘মহল্লাদার’ শব্দের পরিবর্তে ‘গ্রাম পুলিশ’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হবে।
এটি মূলত ২০১৫ সালের বিদ্যমান বিধিমালার পরিভাষাগত সংশোধন। এর মাধ্যমে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সরকারি পরিচিতি ও পদবিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কবে থেকে কার্যকর হবে নতুন পদবি?
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের জন্য নতুন পদবি কার্যকরের বিষয়েও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংশোধনীটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, নতুন পদবি ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো কার্যকর তারিখের অপেক্ষা করতে হবে না। গেজেট প্রকাশের পর থেকেই সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় নতুন পরিভাষা প্রযোজ্য হয়েছে।
গ্রাম পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব ও ভূমিকা
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রশাসনিক কাঠামোয় গ্রাম পুলিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী। ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে কর্মরত এ বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করেন।
তাঁদের উল্লেখযোগ্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
১. স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনকে সহযোগিতা করা।
২. ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে সহায়তা প্রদান করা।
৩. সরকারি নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৪. স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
৫. বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা করা।
৬. স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় সহায়তা করা।
এ কারণে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর পদবি পরিবর্তনের বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বেতন-ভাতা ও চাকরির অন্যান্য সুবিধায় কি পরিবর্তন এসেছে?
গেজেট প্রকাশের পর গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বেতন-ভাতা, চাকরির সুযোগ-সুবিধা এবং পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে মূলত পদবির নাম পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
এই প্রজ্ঞাপনে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের—
- বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
- নতুন বেতন গ্রেড নির্ধারণ করা হয়নি।
- পদোন্নতির নতুন নিয়ম ঘোষণা করা হয়নি।
- চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
- নিয়োগের যোগ্যতা বা চাকরির বয়সসীমা পরিবর্তন করা হয়নি।
তাই পদবির পরিবর্তনকে বেতন-ভাতা বা চাকরির আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে পরিবর্তন আসতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পৃথক সরকারি আদেশ বা প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন হবে।
নতুন ও পুরোনো পদবির তুলনামূলক তালিকা
| ক্রমিক | পূর্বের পদবি | সংশোধিত পদবি |
|---|---|---|
| ১ | দফাদার | গ্রাম পুলিশ প্রধান |
| ২ | মহল্লাদার | গ্রাম পুলিশ |
ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়বে?
নতুন গেজেট কার্যকর হওয়ার ফলে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরের দাপ্তরিক কার্যক্রমে সংশোধিত পদবি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের পরিচয়পত্র, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, বিভিন্ন তালিকা, রেজিস্টার এবং সরকারি নথিতে নতুন পদবি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একই সঙ্গে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সরকারি পরিচিতিতে নতুন পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে বাহিনীর সাংগঠনিক পরিচয় আরও সুস্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়।
শেষ কথা
গ্রাম পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রচলিত দফাদার ও মহল্লাদার পদবি পরিবর্তন করে সরকার নতুন নাম নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে দফাদারদের পরিচয় হবে ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’ এবং মহল্লাদারদের পরিচয় হবে ‘গ্রাম পুলিশ’। স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনটি ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তন আপাতত পদবির নাম সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বেতন-ভাতা, চাকরির মর্যাদা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ২ নভেম্বর ২০২৬; স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।




