সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারির পর নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১৩তম গ্রেডের মূল বেতন ২৪,০০০ টাকা থেকে ৫৮,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন স্কেলের সর্বোচ্চ বা পূর্ণ বেতন একবারে কার্যকর হচ্ছে না; নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ধাপে ধাপে বর্ধিত অংশ যুক্ত হবে।
প্রদত্ত বেতন নির্ধারণ বিবরণীতে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ১৩তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ২২,৯৬০ টাকা ধরে নতুন বেতন নির্ধারণের একটি বিস্তারিত উদাহরণ দেখানো হয়েছে। সেই হিসাবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পূর্ণ নির্ধারিত মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৯,১০০ টাকা। এরপর তিন ধাপে বর্ধিত বেতন কার্যকর হওয়ার কারণে পর্যায়ভেদে মাসিক মূল বেতনের পরিমাণ হবে ৩১,০৩০ টাকা, ৩৫,০৬৫ টাকা এবং শেষ পর্যন্ত ৩৯,১০০ টাকা।
১৩তম গ্রেডের পুরোনো ও নতুন বেতন কাঠামো
২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেলে ১৩তম গ্রেডের বেতনস্কেল ছিল ১১,০০০–২৬,৫৯০ টাকা। প্রদত্ত হিসাবের উদাহরণে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মূল বেতন ধরা হয়েছে ২২,৯৬০ টাকা।
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ ১৩তম গ্রেডের বেতনস্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে—
২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা।
প্রকাশিত গেজেটভিত্তিক প্রতিবেদনে ১৩তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২৪ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ব্যক্তির বিদ্যমান মূল বেতন, বেতনস্কেলের ধাপ এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের নিয়ম অনুযায়ী নতুন মূল বেতন নির্ধারণ হবে। ফলে ১৩তম গ্রেডের প্রত্যেক কর্মচারীর নতুন মূল বেতন একই অঙ্কে হবে—এমনটি নয়।
২২,৯৬০ টাকা মূল বেতন কীভাবে ৩৯,১০০ টাকায় গেল?
প্রদত্ত হিসাবের মূল বিষয়টি হলো বেতনস্কেলের ধাপ অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারণ।
৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মূল বেতন ছিল:
২২,৯৬০ টাকা
নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে সংশ্লিষ্ট ধাপের হিসাব করে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পূর্ণ নির্ধারিত মূল বেতন হয়েছে:
৩৯,১০০ টাকা।
অর্থাৎ পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হলে মোট বৃদ্ধি হবে—
৩৯,১০০ – ২২,৯৬০ = ১৬,১৪০ টাকা।
অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট উদাহরণে পূর্ণ বাস্তবায়নের পর মাসিক মূল বেতন ১৬,১৪০ টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে এই ১৬,১৪০ টাকা একবারে যোগ হচ্ছে না। নতুন প্রজ্ঞাপনে বর্ধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ম–৯ম গ্রেডে বর্ধিত অংশের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম–২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে; পরবর্তী ধাপে যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ কার্যকর হবে।
১৩তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ধাপভিত্তিক হিসাব
প্রদত্ত বিবরণী অনুযায়ী—
| ধাপ | সময়কাল | কার্যকর বৃদ্ধির হার | মাসিক মূল বেতন |
|---|---|---|---|
| প্রথম ধাপ | ১ জুলাই–৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ | ৫০% | ৩১,০৩০ টাকা |
| দ্বিতীয় ধাপ | ১ জানুয়ারি–৩০ জুন ২০২৭ | ৭৫% | ৩৫,০৬৫ টাকা |
| তৃতীয় ধাপ | ১ জুলাই ২০২৭ থেকে | ১০০% | ৩৯,১০০ টাকা |
এখানে প্রথম ধাপের হিসাবটি বোঝা যায় এভাবে:
পূর্ণ বেতন বৃদ্ধি = ১৬,১৪০ টাকা
এর ৫০ শতাংশ = ৮,০৭০ টাকা
পুরোনো মূল বেতন = ২২,৯৬০ টাকা
সুতরাং,
২২,৯৬০ + ৮,০৭০ = ৩১,০৩০ টাকা।
দ্বিতীয় ধাপে পূর্ণ বৃদ্ধির ৭৫ শতাংশ কার্যকর হলে—
১৬,১৪০ × ৭৫% = ১২,১০৫ টাকা
২২,৯৬০ + ১২,১০৫ = ৩৫,০৬৫ টাকা।
আর তৃতীয় ধাপে শতভাগ কার্যকর হলে—
২২,৯৬০ + ১৬,১৪০ = ৩৯,১০০ টাকা।
কেন ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার টাকা থেকে সরাসরি ৩৯,১০০ টাকা হচ্ছে না?
এখানেই বেতন নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
২৪,০০০ টাকা হলো ১৩তম গ্রেডের নতুন বেতনস্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ। কিন্তু যিনি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ওই গ্রেডে প্রারম্ভিক ধাপে ছিলেন না এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, তাঁর নতুন মূল বেতন নির্ধারণের সময় শুধু ২৪ হাজার টাকা ধরে হিসাব করা হবে না।
গেজেটের বেতন নির্ধারণ পদ্ধতিতে বিদ্যমান মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ এবং নতুন অনুরূপ স্কেলের ধাপ বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে হিসাবের পর প্রাপ্ত অঙ্ক নতুন স্কেলের নির্ধারিত কোনো ধাপের সঙ্গে না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণের বিধানও রয়েছে।
এ কারণে ১৩তম গ্রেডের ২৪,০০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতন এবং কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর ৩৯,১০০ টাকা নির্ধারিত নতুন মূল বেতন—দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে ভুল হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কী হবে?
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হয়েছে। তবে পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই একবারে কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ম–২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তা ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ কার্যকর হবে।
ফলে ১৩তম গ্রেডের উপরের উদাহরণে—
জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬: ৩১,০৩০ টাকা
জানুয়ারি–জুন ২০২৭: ৩৫,০৬৫ টাকা
জুলাই ২০২৭ থেকে: ৩৯,১০০ টাকা
মূল বেতন হিসেবে কার্যকর হবে।
বকেয়া নিয়েও থাকছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় গেজেট প্রকাশের আগে যেসব মাস অতিক্রান্ত হয়েছে, সেসব সময়ের প্রাপ্য অর্থও হিসাবের আওতায় আসবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর কারণে প্রাপ্য বর্ধিত বেতন বকেয়া হিসেবে পাওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ১ জুলাই থেকে গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত কোনো কর্মচারী বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকলে তা নতুন বেতন কাঠামোর প্রাপ্য অর্থের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন মূল বেতন, কার্যকর ধাপ এবং ইতোমধ্যে পাওয়া বিশেষ সুবিধা—এই তিনটি বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে।
শুধু মূল বেতন বাড়লেই মোট বেতন একই হারে বাড়বে না
১৩তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বেতনস্কেলের সব সুবিধা একই তারিখে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হচ্ছে না।
প্রকাশিত গেজেটভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতার নতুন কাঠামো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ২০২৬ ও ২০২৭ সালে মূল বেতন ধাপে ধাপে বাড়লেও নতুন বেতনস্কেলের সব ভাতা একই সঙ্গে পূর্ণ হারে যুক্ত হবে না।
এ কারণে কোনো কর্মচারী ৩৯,১০০ টাকা নতুন মূল বেতন পেলেই তাঁর মোট মাসিক বেতন সরাসরি পুরোনো বেতনের সঙ্গে ১৬,১৪০ টাকা বেশি হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা ঠিক হবে না। মোট প্রাপ্য নির্ভর করবে প্রযোজ্য বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সহায়ক, যাতায়াত, টিফিন ও অন্যান্য ভাতার ওপর।
১৩তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মূল বিষয়গুলো এক নজরে
পুরোনো স্কেল: ১১,০০০–২৬,৫৯০ টাকা
৩০ জুন ২০২৬-এর উদাহরণমূলক মূল বেতন: ২২,৯৬০ টাকা
নতুন ১৩তম গ্রেডের স্কেল: ২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা
উদাহরণে পূর্ণ নির্ধারিত নতুন মূল বেতন: ৩৯,১০০ টাকা
পূর্ণ বৃদ্ধির পরিমাণ: ১৬,১৪০ টাকা
প্রথম ধাপ: ৩১,০৩০ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ৩৫,০৬৫ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ৩৯,১০০ টাকা
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
উপরের ৩১,০৩০, ৩৫,০৬৫ ও ৩৯,১০০ টাকা একটি নির্দিষ্ট বেতন-নির্ধারণ উদাহরণের হিসাব। ১৩তম গ্রেডে কর্মরত প্রত্যেক ব্যক্তির ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের বিধান এক না হলে চূড়ান্ত নতুন মূল বেতনও ভিন্ন হতে পারে। গেজেটের বেতন নির্ধারণ পদ্ধতিই ব্যক্তিভিত্তিক চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণের ভিত্তি।
সারকথা: জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ ১৩তম গ্রেডের নতুন স্কেল ২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা হলেও নির্দিষ্ট কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ হবে তাঁর বিদ্যমান বেতন ও নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপের ভিত্তিতে। প্রদত্ত উদাহরণে ২২,৯৬০ টাকা মূল বেতন থেকে পূর্ণ নির্ধারিত বেতন ৩৯,১০০ টাকা, যা ২০২৬–২৭ সালে ৩১,০৩০ → ৩৫,০৬৫ → ৩৯,১০০ টাকা—এই তিন ধাপে কার্যকর হওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে।





