নবম পে স্কেলের গেজেট শুক্রবার-শনিবারেও হতে পারে? যা বলছেন দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আবারও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার—সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের মতামত ও দাবি।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, সরকার চাইলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা রাতের যেকোনো সময়ও নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাই শুধু রবিবারকে গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য দিন হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য
মাহমুদুল হাসান তাঁর বক্তব্যে বলেন—
“সরকার ইচ্ছে করলে সাপ্তাহিক ছুটি/যে কোনো ছুটির দিন গেজেট প্রকাশ করতে পারেন! এমনকি রাতের যে কোনো সময়!! তাই যারা বিভিন্ন তথ্য পোস্ট করছেন, সব মনগড়া!!! পে স্কেলের গেজেট যে কোনো সময় হতে পারে!! রবিবার নয়, সরকার ইচ্ছে করলে আজ-কালকের মধ্যেও সম্ভব!! ছবির গেজেটগুলো শুক্রবার, শনিবার হয়েছে।”
অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশের ক্ষেত্রে শুক্রবার বা শনিবারকে একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক হবে না। সরকার প্রয়োজন মনে করলে ছুটির দিনেও বিশেষ গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে।
ছুটির দিনে গেজেট প্রকাশের নজির আছে
এখানে একটি বিষয় অবশ্যই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সরকারি গেজেট যে শুক্রবার বা অন্যান্য ছুটির দিনে প্রকাশ হতে পারে—এর বাস্তব নজির রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের (বিজি প্রেস) প্রকাশিত গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল ২০২৬ শুক্রবার বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার এবং ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবারও অতিরিক্ত গেজেট প্রকাশের রেকর্ড রয়েছে।
এ ছাড়া বিজি প্রেসের সরকারি তালিকায় বিভিন্ন সময় ছুটির দিনেও গেজেট প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি ২৫ জানুয়ারি ১৯৯২ শনিবার বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার সরকারি রেকর্ডও রয়েছে।
সুতরাং, “শুক্রবার বা শনিবার গেজেট প্রকাশ করা যায় না”—এমন কথা বলা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।
তবে প্রশ্ন উঠছে নবম পে-স্কেল নিয়ে
এখানেই মূল বিতর্ক। ছুটির দিনে সাধারণ বা বিশেষ কোনো গেজেট প্রকাশের নজির থাকা এবং জাতীয় পে-স্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত গেজেট ছুটির দিনে প্রকাশিত হওয়া—দুটি আলাদা বিষয়।
অতীতের জাতীয় পে-স্কেলের নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল তথা জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর গেজেট প্রকাশের তারিখ ছিল ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫। সরকারি নথিতেও এটি বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি গেজেটের বিভিন্ন সংরক্ষিত নথিতে ২০০৫ ও ১৯৯৭ সালের জাতীয় বেতনস্কেলের প্রকাশনার তারিখও পাওয়া যায়। যেমন ২০০৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেলের গেজেট ২৮ মে ২০০৫ তারিখে এবং ১৯৯৭ সালের জাতীয় বেতনস্কেলের সংশ্লিষ্ট আদেশ ১৮ নভেম্বর ১৯৯৭ তারিখের গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল।
অতীতের জাতীয় পে-স্কেলগুলোর প্রকাশনার দিন-তারিখ বিশ্লেষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বলছেন, আগের আটটি জাতীয় পে-স্কেলের ক্ষেত্রে শুক্রবার বা শনিবারে মূল পে-স্কেল গেজেট প্রকাশের নজির তারা খুঁজে পাননি। তবে এই দাবিকে সব আটটি পে-স্কেলের সরকারি মূল গেজেটের তারিখ একসঙ্গে যাচাই করে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
তাহলে শুক্রবার-শনিবারে নবম পে-স্কেলের গেজেট কি হতে পারে?
এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুক্রবার বা শনিবার গেজেট প্রকাশ অসম্ভব—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বিজি প্রেসের সরকারি নথিই দেখাচ্ছে, ছুটির দিনেও গেজেট প্রকাশ হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট শুক্রবার বা শনিবারই প্রকাশ হবে। এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা বিজি প্রেসে সংশ্লিষ্ট গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করা যায় না।
অর্থাৎ মাহমুদুল হাসানের বক্তব্যকে দুটি অংশে দেখা যায়। প্রথমত, ছুটির দিনেও গেজেট প্রকাশের সুযোগ ও নজির রয়েছে—এটি তথ্যসম্মত। দ্বিতীয়ত, নবম পে-স্কেলের গেজেট শুক্রবার বা শনিবার প্রকাশ হবে কি না—এটি এখনো সরকারি ঘোষণার বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন দাবি কতটা নির্ভরযোগ্য?
নবম পে-স্কেলের গেজেট নিয়ে গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তারিখ ও সময় উল্লেখ করে একাধিক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে। কখনো বলা হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে গেজেট হবে, আবার কখনো নির্দিষ্ট সময়ের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি গেজেট প্রকাশের আগে এসব দাবিকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গেজেটই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উৎস। বিজি প্রেসের সরকারি তালিকায় ২০২৬ সালের বিভিন্ন মাসের অতিরিক্ত গেজেটের তারিখ ও বিষয়বস্তু সরাসরি দেখা যায়।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের অপেক্ষা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। শুক্রবার, শনিবার কিংবা রবিবার—কোন দিনে গেজেট প্রকাশ হবে, সেটি নিশ্চিত করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হবে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন এবং বিজি প্রেসে গেজেট প্রকাশ।
তাই অতীতের পে-স্কেলের প্রকাশনার দিন নিয়ে আলোচনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটিও মনে রাখা দরকার—আগের পে-স্কেল যেদিন প্রকাশ হয়েছে, ভবিষ্যতের পে-স্কেলও ঠিক একই দিনে প্রকাশ হতে হবে—এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই।
ফলে শুক্রবার ও শনিবার বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না; আবার “এই দুদিনের মধ্যেই গেজেট হবে”—এমন দাবিও সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিত বলা যায় না। এখন মূল অপেক্ষা সরকারি গেজেটের।
নোট: ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলের সরকারি গেজেটের তারিখ ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫—এটি সরকারি নথি দিয়ে নিশ্চিত। অতীতের সব আটটি পে-স্কেলের প্রকাশনার বার (শুক্রবার/শনিবারসহ) নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি একত্রে যাচাই না করে “কখনোই হয়নি” ধরনের চূড়ান্ত দাবি করা ঠিক হবে না।

