সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম ঘিরে ‘ডাটা এন্ট্রি’, ‘ফরম পূরণ’ ও ‘অফিস খরচের’ নামে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক সমাজের সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, বেতন নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো শিক্ষক যেন অযৌক্তিক আর্থিক চাপ বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের কাজ একটি নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সার্ভিস বুক যাচাই, অনলাইন ফরম পূরণ, বেতনসংক্রান্ত নথি প্রস্তুত এবং অনুমোদনের মতো কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব স্পষ্ট থাকা জরুরি। এসব কাজের সুযোগ নিয়ে কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে এটিকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা না করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
মোহনগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসের নোটিশে পে-ফিক্সেশনসংক্রান্ত নির্দেশনা
সংযুক্ত নথিতে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসের একটি নোটিশ দেখা যায়। নোটিশটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
নথির দৃশ্যমান অংশে ‘Pay Fixation-2026 GoB Staff-Running (Without User ID)’ অপশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ফিক্সেশন ফরম একত্র করে জমা দেওয়া, বিদ্যালয়ের নাম ও ফরমের সংখ্যা উল্লেখ করা এবং প্রধান শিক্ষকের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার নির্দেশনার কথাও দেখা যায়।
নোটিশটিতে শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের ফরম যথাযথভাবে প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই নোটিশে শিক্ষকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের কোনো নির্দেশনা রয়েছে—এমন প্রমাণ দৃশ্যমান নয়। তাই নোটিশটিকে অর্থ আদায়ের অভিযোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নথিটির তারিখ ও অন্যান্য তথ্যও মূল কপি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নোটিশের নির্দেশনা এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগকে পৃথক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ডাটা এন্ট্রি ও সার্ভিস বুকের কাজের জন্য টাকা নেওয়া কি বৈধ?
পে-ফিক্সেশনের জন্য কর্মচারীর চাকরির বিবরণ, বর্তমান বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, যোগদানের তারিখ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
কিন্তু দাপ্তরিক কাজের নাম ব্যবহার করে অর্থ দাবি করা হলেই সেই অর্থকে বৈধ অফিস খরচ বলা যায় না। অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি, অনুমোদিত ফি-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত আদেশ আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
যদি কোনো কাজের জন্য সরকারি বিধিতে নির্ধারিত ফি থাকে, তাহলে তার পরিমাণ ও জমা দেওয়ার পদ্ধতি স্পষ্ট থাকা উচিত। অন্যদিকে, কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দাবি বা আদায় করা হলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে অর্থের পরিমাণ, কী কাজের জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে, কে টাকা চেয়েছেন এবং কোনো রসিদ বা লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
পে-ফিক্সেশন নিয়ে শিক্ষকদের উদ্বেগ কেন?
বেতন নির্ধারণে ভুল হলে একজন শিক্ষকের মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ভবিষ্যৎ বেতন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধায় প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে পে-ফিক্সেশনের প্রতিটি ধাপ শিক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন ব্যবস্থায় তথ্য পূরণ করতে গিয়ে কোনো শিক্ষক সমস্যায় পড়লে তাঁকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে, সার্ভিস বুকের তথ্যের সঙ্গে অনলাইন তথ্যের অমিল থাকলে তা সংশোধনের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি জানানো উচিত।
এমন পরিস্থিতিতে যদি অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপ তৈরি হয়, তাহলে শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষক নিজেরা অনলাইন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন না, তাঁদের যেন অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ অর্থ আদায় করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিটি জেলায় কঠোর অফিস আদেশ জারির দাবি
শিক্ষকদের কাছ থেকে পে-ফিক্সেশনের নামে অননুমোদিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বন্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের (DPEO) কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের প্রত্যাশা, প্রতিটি জেলায় এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে এবং উপজেলা পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন তদারক করা হবে।
এ ক্ষেত্রে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।
প্রথমত, লিখিত নির্দেশনা প্রকাশ: পে-ফিক্সেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফরম পূরণ, তথ্য জমা ও সংশোধনের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থসংক্রান্ত নিয়ম পরিষ্কার করা: কোনো কাজের জন্য অনুমোদিত ফি থাকলে তার বিধিগত ভিত্তি ও পরিমাণ জানাতে হবে। অনুমোদনহীন অর্থ আদায় গ্রহণযোগ্য নয়—এ বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা: শিক্ষকরা যাতে পরিচয় ও ঘটনার তথ্যসহ অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা রাখতে হবে।
চতুর্থত, তদন্ত ও জবাবদিহি: অভিযোগ পাওয়ার পর তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
পঞ্চমত, উপজেলা পর্যায়ে তদারকি: শুধু অফিস আদেশ জারি করাই যথেষ্ট নয়; বিদ্যালয় ও উপজেলা পর্যায়ে নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
অভিযোগ জানাতে পারেন যেসব দপ্তরে
কোনো শিক্ষক পে-ফিক্সেশন বা ডাটা এন্ট্রির নামে অননুমোদিত অর্থ দাবির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।
-
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO): উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ জানাতে।
-
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (DPEO): জেলা পর্যায়ে শিক্ষা প্রশাসনের কাছে তদন্ত ও প্রতিকারের আবেদন করতে।
-
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE): সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চাইতে।
-
সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়: বেতন নির্ধারণের নিয়ম, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এবং অর্থসংক্রান্ত বিধান যাচাই করতে।
অভিযোগ জানানোর সময় তারিখ, অর্থ দাবির পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বার্তা, রসিদ বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক প্রমাণ থাকলে তা সংরক্ষণ করা উচিত। এতে অভিযোগ যাচাই ও তদন্তের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি
শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত রাখা শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো শিক্ষক যেন প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে অযৌক্তিক অর্থ প্রদানের চাপে না পড়েন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করতে হবে। এতে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি এড়ানো যাবে এবং সত্যিকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
শিক্ষকদের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় স্পষ্ট অফিস আদেশ, কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি চালু করা এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সরকারি দাপ্তরিক কাজের নামে অননুমোদিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মূল দাবি একটাই—শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে কোনো অনিয়ম নয়, কোনো অননুমোদিত অর্থ আদায় নয়; বরং নিয়ম মেনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।




