সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সম্ভাব্য বকেয়া হিসাব এবং মাসভিত্তিক পাওনার বিবরণী তৈরির কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে একটি সমন্বিত ডিজিটাল বেতন হিসাব ব্যবস্থা। এতে রয়েছে বকেয়া বেতন ক্যালকুলেটর, গেজেটেড কর্মকর্তাদের বেতন বিল প্রস্তুতের জন্য টি.আর. ফরম-১৩ এবং কর্মচারীদের বেতন বিল তৈরির জন্য টি.আর. ফরম-১৫। প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব তৈরি, বিলের প্রিভিউ, PDF প্রস্তুত এবং তথ্য ব্যাকআপ নেওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিশেষ করে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর আলোকে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ এবং আগের সময়ে উত্তোলিত বেতনের সঙ্গে প্রাপ্য অর্থের পার্থক্য হিসাব করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সহায়ক হতে পারে। কারণ বেতন বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং অন্যান্য সমন্বয় একসঙ্গে বিবেচনা করে বকেয়া নির্ধারণ করা সাধারণ হিসাবের তুলনায় বেশ জটিল।
নতুন বেতন নির্ধারণ থেকে বকেয়া হিসাব, থাকছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
প্রস্তুতকৃত সফটওয়্যারের প্রথম অংশে রয়েছে বকেয়া বেতন ক্যালকুলেটর। এখানে ব্যবহারকারীকে নিজের গ্রেড, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন, পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ এবং নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ দিতে হবে।
এরপর নতুন বেতন কাঠামোয় নির্ধারিত ধাপ নির্বাচন করতে হবে। ক্যালকুলেটরের নিয়ম অনুযায়ী সমান ধাপ পাওয়া গেলে সেটি গ্রহণ করা হবে। সমান ধাপ না থাকলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ বিবেচনা করা হবে।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, গ্রেড ও বর্তমান মূল বেতন নির্বাচন করলে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীকে প্রতিটি হিসাব আলাদাভাবে করতে হবে না।
এছাড়া নিজের গ্রেডের নতুন বেতন স্কেলের ধাপগুলো হাতে লিখে নির্ধারিত ধাপ ও ইনক্রিমেন্ট বের করার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।
১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্টসহ নতুন মূল বেতন নির্ধারণ
নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্য ক্যালকুলেটরে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের ইনক্রিমেন্ট এবং ১ জুলাই ২০২৭ তারিখের ইনক্রিমেন্টের জন্য পৃথক ইনপুট রাখা হয়েছে।
হিসাবের প্রথম পর্যায়ে পুরোনো মূল বেতন থেকে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ বাদ দিয়ে পার্থক্য বের করা হবে। এরপর নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে সেই পার্থক্য যোগ করে নতুন বেতনের ভিত্তি নির্ধারণ করা হবে।
পরবর্তী সময়ে সমান অথবা পরবর্তী উচ্চতর ধাপ নির্বাচন করে ইনক্রিমেন্টসহ পূর্ণ নতুন মূল বেতন নির্ণয় করা হবে।
ক্যালকুলেটরটি শুধু চূড়ান্ত অঙ্ক দেখাবে না, বরং কোন ধাপে কীভাবে বেতন নির্ধারিত হয়েছে, সেটিও ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শন করবে। ফলে ব্যবহারকারী নিজের বেতন নির্ধারণের হিসাব সহজে পর্যালোচনা করতে পারবেন।
পর্যায়ভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হিসাবও করা যাবে
ক্যালকুলেটরটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে পর্যায়ভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হিসাব।
এতে প্রথম পর্যায়ে কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হবে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট কত শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
সফটওয়্যারের হিসাবের মডেল অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের নির্ধারিত অংশ মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে অবশিষ্ট বৃদ্ধির অংশ যোগ করা হবে। সবশেষে পূর্ণ নতুন মূল বেতন হিসাব করা হবে।
এখানে ১ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখে দ্বিতীয় পর্যায়ের অবশিষ্ট অংশ যুক্ত করার এবং ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে পূর্ণ নতুন মূল বেতন প্রদর্শনের হিসাব রাখা হয়েছে।
তবে পর্যায়ভিত্তিক এই হিসাব সফটওয়্যারের কনফিগারেশন অনুযায়ী তৈরি হয়। প্রকৃত সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত কার্যকর তারিখ ও বেতন বৃদ্ধির হার যাচাই না করে এটিকে চূড়ান্ত সরকারি হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
আগের উত্তোলিত বেতন বাদ দিয়ে পাওয়া যাবে সম্ভাব্য বকেয়ার হিসাব
সরকারি চাকরিজীবীদের বকেয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইতোমধ্যে উত্তোলিত অর্থের সমন্বয়।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কোনো কর্মচারীর যত টাকা পাওনা হওয়ার কথা, তার বিপরীতে তিনি আগে কত টাকা বেতন ও ভাতা গ্রহণ করেছেন, সেটি বাদ দিয়ে প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয় করতে হয়।
এই কাজ সহজ করতে ক্যালকুলেটরে ‘যা তুলেছেন’ নামে আলাদা একটি বিভাগ রাখা হয়েছে।
এখানে গৃহীত মূল বেতন, বাড়িভাড়া ভাতা, বিশেষ সুবিধা এবং অন্যান্য মাসিক সমন্বয়ের অঙ্ক দেওয়া যাবে।
গৃহীত মূল বেতনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বসানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। একইভাবে বাড়িভাড়া ও বিশেষ সুবিধা নির্ধারিত শতকরা হারের ভিত্তিতে হিসাব করা যাবে। প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারী নিজেই অঙ্ক পরিবর্তন করতে পারবেন।
এরপর নতুন আদেশ অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ থেকে আগে উত্তোলিত অর্থ বাদ দিয়ে মাসিক সমন্বয়যোগ্য বকেয়া নির্ধারণ করা হবে।
মাসভিত্তিক বকেয়া বিবরণী ও মোট পাওনা
কোনো চাকরিজীবীর একাধিক মাসের বকেয়া থাকলে সব মাসের হিসাব একত্রে নির্ণয় করা প্রয়োজন। এজন্য সফটওয়্যারে বকেয়ার শুরুর মাস এবং মোট মাসের সংখ্যা নির্বাচন করার সুবিধা রাখা হয়েছে।
ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট সময়কাল নির্বাচন করলে প্রতিটি মাসের জন্য আলাদা হিসাব তৈরি হবে।
বিবরণীতে মূল বেতন, বাড়িভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং অন্যান্য সমন্বয়ের পৃথক হিসাব দেখানো হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মাসে মোট কত টাকা বকেয়া হচ্ছে, সেটিও প্রদর্শিত হবে।
সবশেষে নির্বাচিত সময়ের সব মাসের বকেয়া যোগ করে সর্বমোট পাওনার পরিমাণ পাওয়া যাবে।
এতে কোনো মাসের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে পুরো হিসাব পুনরায় না করে নির্দিষ্ট মাসের তথ্য পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তাদের জন্য টি.আর. ফরম-১৩ প্রস্তুতের সুবিধা
বকেয়া ক্যালকুলেটরের পাশাপাশি গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বিল তৈরির জন্য টি.আর. ফরম নম্বর ১৩ সংযুক্ত করা হয়েছে।
এখানে কর্মকর্তার নাম, পদবি, এনআইডি নম্বর, ভবিষ্য তহবিল হিসাব নম্বর, ডাক জীবনবিমা নম্বর, টিআইএন এবং ব্যাংক বা বাহকের তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া বিলের সাধারণ তথ্য হিসেবে মাস, বছর, দপ্তরের নাম, প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড, টোকেন নম্বর, ভাউচার নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট তারিখ ইনপুট দেওয়া যাবে।
বেতন ও ভাতার বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি কর্তন ও আদায়ের হিসাবও প্রস্তুত করা যাবে।
এই ফরমের অন্যতম সুবিধা হলো, একাধিক কর্মকর্তার বেতন বিল আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়। নতুন কর্মকর্তা যুক্ত করা, আগের কর্মকর্তার তথ্য কপি করে নতুন বিল তৈরি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থাও রয়েছে।
হিসাব সম্পন্ন হলে মোট বেতন ও ভাতা, মোট আদায় এবং কর্তন বাদ দেওয়ার পর প্রদেয় বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখানো হবে।
কর্মচারীদের জন্য টি.আর. ফরম-১৫
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুতের জন্য পৃথকভাবে টি.আর. ফরম নম্বর ১৫ যুক্ত করা হয়েছে।
এই অংশে কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, বিভিন্ন খাতের হিসাব এবং কর্তন-আদায়ের তথ্য প্রস্তুতের ব্যবস্থা রয়েছে।
দপ্তরের কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমের কাঠামো অনুসরণ করে তথ্য ইনপুট দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট খাতের কোড ও নামও সম্পাদনা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফরমটি পূরণ করার পর প্রিভিউ দেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা এবং প্রিন্টের জন্য PDF তৈরি করা যাবে।
অর্থাৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুতের জন্য আলাদা দুটি ব্যবস্থা একই সফটওয়্যারে সংযুক্ত করা হয়েছে।
A4 সাইজে প্রিন্ট ও PDF তৈরির ব্যবস্থা
হিসাব প্রস্তুতের পর সেটি সংরক্ষণ বা দাপ্তরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রিন্ট করার সুবিধাও রাখা হয়েছে।
বকেয়া বেতন ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে তৈরি বিবরণী A4 কাগজে প্রিন্ট করা যাবে। অন্যদিকে টি.আর. ফরম-১৩ ও ফরম-১৫-এর জন্য পৃথক প্রিভিউ এবং PDF তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষ করে বেতন বিলের ক্ষেত্রে একাধিক তথ্য একত্রে সাজিয়ে প্রিন্টযোগ্য ফরম তৈরি করার সুবিধা থাকায় দাপ্তরিক প্রস্তুতির সময় কমতে পারে।
একবার তথ্য দিয়ে ব্যাকআপ, পরে আবার ব্যবহার
সফটওয়্যারটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো তথ্য ব্যাকআপ ও পুনরুদ্ধার।
ব্যবহারকারী ক্যালকুলেটর, ফরম-১৩ এবং ফরম-১৫-এর তথ্য একত্রে JSON ফাইল হিসেবে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
পরবর্তী সময়ে ব্রাউজারের তথ্য হারিয়ে গেলে অথবা অন্য কম্পিউটারে কাজ চালিয়ে যেতে হলে সেই ফাইল থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করা যাবে।
তবে ব্যাকআপ ফাইলে নাম, এনআইডিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য থাকতে পারে। তাই এটি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে এবং অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
হিসাবের নির্ভুলতার জন্য যেসব বিষয় যাচাই জরুরি
স্বয়ংক্রিয় হিসাবের সুবিধা থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, বর্তমান মূল বেতন ও পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ সঠিকভাবে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন বেতন স্কেলের নির্ধারিত ধাপ ও ইনক্রিমেন্টের অঙ্ক যাচাই করতে হবে।
এছাড়া বাড়িভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং পর্যায়ভিত্তিক বেতন বৃদ্ধির হার সঠিক না হলে বকেয়ার অঙ্কেও পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, যোগদানের তারিখ, বেতন সংরক্ষণ কিংবা বিশেষ কোনো বেতন নির্ধারণী আদেশ থাকলে সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সফটওয়্যারটি একটি হিসাব সহায়ক ব্যবস্থা। এটি সরকারি হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণী ব্যবস্থা বা আইবাস++-এর বিকল্প নয়। তাই এর মাধ্যমে পাওয়া হিসাব সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন, বেতন নির্ধারণী শিট এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
শেষ কথা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুত এবং নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সম্ভাব্য বকেয়া নির্ধারণের কাজকে সহজ করার ক্ষেত্রে সমন্বিত এই ডিজিটাল ব্যবস্থা একটি কার্যকর সহায়ক উদ্যোগ হতে পারে।
একই প্ল্যাটফর্মে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট, পর্যায়ভিত্তিক বৃদ্ধি, মাসওয়ারি বকেয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বিল, PDF প্রিন্ট এবং তথ্য ব্যাকআপের সুবিধা থাকায় দাপ্তরিক হিসাব প্রস্তুতের কাজ আরও গোছানোভাবে করা সম্ভব।
তবে চূড়ান্ত বকেয়া কত টাকা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রকৃত বেতন তথ্য, অনুমোদিত বেতন কাঠামো এবং সরকারি বাস্তবায়ন নির্দেশনার ওপর। তাই ক্যালকুলেটরের ফলাফলকে সম্ভাব্য হিসাব হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।




