সরকারি চাকরিতে কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে অর্জিত টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড এবং পরবর্তীতে পদ আপগ্রেডের মাধ্যমে নতুন গ্রেডে উন্নীত হওয়া—এসবের ধারাবাহিকতা ঠিকভাবে উপস্থাপন করা পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো কর্মচারী তৃতীয় শ্রেণির পদে একাধিক টাইম স্কেল পাওয়ার পর দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে সিলেকশন গ্রেড এবং পরে পদ আপগ্রেডের মাধ্যমে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়ে থাকলে, তার বেতন নির্ধারণের ইতিহাস সাধারণ কর্মচারীর তুলনায় কিছুটা জটিল।
বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমে এসব পুরোনো বেতন নির্ধারণের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। iBAS++-এর বেতন নির্ধারণী ব্যবস্থায় নিয়োগ, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড, বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং সমপদে স্কেল উন্নীতকরণ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ সংরক্ষণ করে তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
একাধিক টাইম স্কেল থাকলে কী হবে
ধরা যাক, একজন কর্মচারী প্রথমে তৃতীয় শ্রেণির একটি পদে কর্মরত ছিলেন। ওই পদে কর্মরত অবস্থায় তিনি নিয়ম অনুযায়ী তিনটি টাইম স্কেল অর্জন করেছেন।
এ ক্ষেত্রে তিনটি টাইম স্কেলকে একসঙ্গে একটি সুবিধা হিসেবে না দেখে তিনটি পৃথক বেতন-নির্ধারণের ঘটনা হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত।
অর্থাৎ তার বেতন ইতিহাস হবে—
মূল পদ ও মূল স্কেল → ১ম টাইম স্কেল → ২য় টাইম স্কেল → ৩য় টাইম স্কেল।
প্রতিটি ধাপের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, কার্যকর তারিখ এবং ওই সময় নির্ধারিত মূল বেতন গুরুত্বপূর্ণ। iBAS++-এর সরকারি নির্দেশনায়ও বেতন নির্ধারণ-সংক্রান্ত অফিস আদেশের সফট কপি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।
এরপর সিলেকশন গ্রেড থাকলে সেটিও আলাদা তথ্য
পরবর্তীতে ওই কর্মচারী যদি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে একটি সিলেকশন গ্রেড পেয়ে থাকেন, তাহলে সেটিকে টাইম স্কেলের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা উচিত নয়।
কারণ জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-তে মূল স্কেল, সিলেকশন গ্রেড স্কেল এবং উচ্চতর স্কেল বা টাইম স্কেল পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই পে-ফিক্সেশনের ইতিহাসে ধারাবাহিকতা হবে—
১ম টাইম স্কেল → ২য় টাইম স্কেল → ৩য় টাইম স্কেল → সিলেকশন গ্রেড।
প্রতিটি সুবিধার কার্যকর তারিখ ও সংশ্লিষ্ট আদেশ আলাদাভাবে দেখানো সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
এরপর পদ আপগ্রেড হয়ে ১০ম গ্রেড
এখানে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, পরবর্তীতে তৃতীয় শ্রেণির পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে আপগ্রেড হয়ে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে।
এই পর্যায়কে আগের টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। এটি হচ্ছে পদ/স্কেল উন্নীতকরণের একটি পৃথক ঘটনা।
iBAS++-এর সরকারি পে-ফিক্সেশন নির্দেশনাতেও ‘সমপদে স্কেল উন্নীতকরণ’ এবং অন্যান্য বেতন নির্ধারণের ঘটনাকে আলাদাভাবে বিবেচনার কথা রয়েছে।
অতএব এখানে সংশ্লিষ্ট পদ আপগ্রেডের আদেশ নম্বর, তারিখ, কার্যকর তারিখ এবং ১০ম গ্রেড অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
১০ম গ্রেড থেকে ৭ম গ্রেডে আসার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১০ম গ্রেডে পদ আপগ্রেড হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী পূর্বে অর্জিত তিনটি টাইম স্কেলের সুবিধা Corresponding Scale-এর মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ৭ম গ্রেডে অবস্থান করছেন।
এখানে ৭ম গ্রেডকে সরাসরি ‘চতুর্থ টাইম স্কেল’ বা ‘নতুন সিলেকশন গ্রেড’ হিসেবে দেখানো উচিত হবে না, যদি সংশ্লিষ্ট আদেশে সেটি সেভাবে বলা না থাকে।
বরং বেতন ইতিহাসে বিষয়টি হবে—
পদ আপগ্রেড হয়ে ১০ম গ্রেড → পূর্বে অর্জিত টাইম স্কেলসমূহের স্বীকৃতি/সমন্বয় → অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী Corresponding Scale প্রয়োগ → বর্তমান প্রাপ্য গ্রেড ৭ম।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-তেও পূর্ববর্তী স্কেলের বিপরীতে Corresponding Scale নির্ধারণের বিধান ছিল।
পে-ফিক্সেশনের সময় কোন কোন কাগজ প্রস্তুত রাখবেন
এ ধরনের জটিল সার্ভিস হিস্টরির ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান ৭ম গ্রেডের কাগজ দেখালে যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং ধারাবাহিকভাবে নিচের কাগজগুলো প্রস্তুত রাখা উচিত—
১. মূল নিয়োগপত্র
২. যোগদানপত্র
৩. তৃতীয় শ্রেণির মূল পদের স্কেল-সংক্রান্ত আদেশ
৪. ১ম টাইম স্কেলের অফিস আদেশ
৫. ২য় টাইম স্কেলের অফিস আদেশ
৬. ৩য় টাইম স্কেলের অফিস আদেশ
৭. দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে সিলেকশন গ্রেডের আদেশ
৮. পদ আপগ্রেড হয়ে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার আদেশ
৯. অর্থ মন্ত্রণালয়ের Corresponding Scale/সমন্বয় সংক্রান্ত আদেশ
১০. ১০ম গ্রেড থেকে বর্তমান ৭ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের আদেশ
১১. পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের কপি/ভেরিফিকেশন নম্বর
১২. ৩০ জুন ২০১৫ ও পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বেতন নির্ধারণের তথ্য, যদি প্রযোজ্য হয়।
iBAS++-এর সরকারি নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়োগ, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও বেতন পুনর্নির্ধারণসহ সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশের কপি প্রস্তুত রাখার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
২০১৫ সালের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ কার্যকর হওয়ার সময় আগের স্কেলগুলোর বিপরীতে Corresponding Scale নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ২০১৫ সালের অনলাইন পে-ফিক্সেশন ব্যবস্থায় ৩০ জুন ২০১৫ তারিখে প্রাপ্ত গ্রেড ও মূল বেতনের ভিত্তিতে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখের বেতন নির্ধারণের কাঠামো রাখা হয়েছিল।
অনলাইন পে-ফিক্সেশন FAQ-তেও বলা হয়েছিল, ১ জুলাই থেকে ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত প্রাপ্ত ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয় অনলাইন ফরমে সরাসরি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট SRO, অর্থ বিভাগ ও CGA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তা নিষ্পত্তি করতে হবে।
অতএব কোনো কর্মচারীর পুরোনো টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড থাকলে শুধু বর্তমান গ্রেড দেখে পুরো বেতন ইতিহাস তৈরি করা উচিত নয়।
আপনার মতো ক্ষেত্রে বেতন ইতিহাসের আদর্শ কাঠামো
বিষয়টি সহজভাবে লিখলে এভাবে দাঁড়ায়—
মূল পদ: তৃতীয় শ্রেণি
↓
১ম টাইম স্কেল: সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী
↓
২য় টাইম স্কেল: সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী
↓
৩য় টাইম স্কেল: সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী
↓
সিলেকশন গ্রেড: দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে
↓
পদ আপগ্রেড: দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা, ১০ম গ্রেড
↓
অর্থ মন্ত্রণালয়ের Corresponding Scale আদেশ: পূর্বে অর্জিত সুবিধা সমন্বয়
↓
বর্তমান বেতন নির্ধারণ: ৭ম গ্রেড
এভাবে সাজালে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সহজে বুঝতে পারবেন যে ৭ম গ্রেডে পৌঁছানোর পেছনে কোন কোন পূর্ববর্তী বেতন-নির্ধারণের ঘটনা কাজ করেছে।
নতুন পে-ফিক্সেশনে আরও সতর্কতা
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম বর্তমানে iBAS++-এর মাধ্যমে এগোচ্ছে। অর্থ বিভাগের জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ সংক্রান্ত পৃথক পেজও বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে এবং ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে iBAS++ Pay Fixation Sub-System-এ জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বেতন নির্ধারণ কার্যক্রমের জন্য জনবলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাঠানোর বিষয়ে সরকারি নোটিশ প্রকাশ হয়েছে।
তাই পুরোনো টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে শুধু বর্তমান ৭ম গ্রেড দিয়ে পে-ফিক্সেশন করার চেষ্টা করলে পরবর্তী যাচাইয়ের সময় প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে তিনটি টাইম স্কেল যদি পরবর্তী Corresponding Scale-এর মাধ্যমে সমন্বিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশটিই হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কারণ ১০ম থেকে ৭ম গ্রেডে যাওয়ার ভিত্তি এবং পূর্বে অর্জিত সুবিধাগুলোর সমন্বয়ের আইনগত/প্রশাসনিক ভিত্তি ওই আদেশে কীভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেটিই চূড়ান্তভাবে অনুসরণ করতে হবে।
শেষ কথা
সুতরাং আপনার মতো কর্মচারীর ক্ষেত্রে পে-ফিক্সেশনের সময় “আগে তিনটি টাইম স্কেল পেয়েছি, পরে একটি সিলেকশন গ্রেড পেয়েছি, তারপর পদ আপগ্রেড হয়ে ১০ম গ্রেড হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের Corresponding Scale আদেশের মাধ্যমে পূর্বের সুবিধা সমন্বয় করে বর্তমানে ৭ম গ্রেডে আছি”—এই পুরো ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঠিক কোন তারিখে কোন গ্রেড/স্কেলে কত টাকা বেতন নির্ধারিত হয়েছিল এবং ১০ম থেকে ৭ম গ্রেডে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা কী হবে—তা সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ না দেখে চূড়ান্তভাবে বলা উচিত নয়। কারণ এখানে একটি আদেশের কার্যকর তারিখ বা ব্যবহৃত স্কেল পরিবর্তিত হলে পরবর্তী বেতন নির্ধারণও পরিবর্তিত হতে পারে।
বর্তমান iBAS++ নির্দেশনাও সংশ্লিষ্ট সব বেতন-নির্ধারণের অফিস আদেশ ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
iBAS++ অনলাইন বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থা
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ — অর্থ বিভাগ




