জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের (Pay Fixation) প্রক্রিয়া নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে আইবাস++-এ পে-ফিকেশন করতে কত তথ্য দিতে হবে, পুরোনো বেতনের হিসাব কীভাবে নতুন স্কেলে যাবে এবং কোথায় চূড়ান্ত বেতন দেখা যাবে—এসব বিষয় নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তিতে রয়েছেন।
তবে আইবাস++-এর প্রদর্শিত পে-ফিকেশন কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সাজানো এবং মূল হিসাবের বড় অংশই সিস্টেমনির্ভর। কর্মচারীকে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজন এবং শেষ পর্যন্ত সাবমিট করতে হবে।
৭টি ট্যাবেই সাজানো পুরো পে-ফিকেশন প্রক্রিয়া
আইবাস++ পে-ফিকেশন ব্যবস্থায় কর্মচারীর তথ্য কয়েকটি পৃথক ট্যাবে ভাগ করা হয়েছে। প্রদর্শিত ইন্টারফেসে সাধারণ তথ্য, পারিবারিক তথ্য, অফিসের তথ্য, উচ্চতর স্কেল/গ্রেড সংক্রান্ত তথ্য, পূর্ববর্তী জাতীয় বেতনস্কেলের তথ্য, জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ এবং সারসংক্ষেপ—এ ধরনের ধাপ দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে একসঙ্গে বিপুল তথ্য নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। বরং একটি ট্যাব থেকে পরবর্তী ট্যাবে গিয়ে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে।
প্রতিটি ধাপ যাচাই করে Save & Continue করার মাধ্যমে পরবর্তী অংশে যেতে হবে।
পুরোনো বেতনের তথ্য থেকেই শুরু হবে হিসাব
প্রদর্শিত পে-ফিকেশন স্ক্রিনে ৩০-০৬-২০২৬ তারিখের বেতন-সংক্রান্ত তথ্য দেখানো হয়েছে। সেখানে মূল বেতন, প্রযোজ্য দাগ/ভাতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হিসাবের তথ্য আলাদাভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
অর্থাৎ নতুন বেতন নির্ধারণের আগে কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বিদ্যমান বেতন কাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এরপর ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের হিসাব দেখানো হয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগের বেতন-অবস্থা, ইনক্রিমেন্ট এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্যের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী ধাপের হিসাব তৈরি করা হচ্ছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন স্কেলের হিসাব
প্রদর্শিত স্ক্রিনে ০১-০৭-২০২৬ তারিখকে কেন্দ্র করে নতুন বেতন নির্ধারণের একাধিক ধাপ দেখানো হয়েছে।
সেখানে প্রারম্ভিক ধাপ, মোট নির্ধারণ, নতুন বেতনের সমন্বয়/উচ্চতর ধাপ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ—এ ধরনের হিসাব ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে।
অর্থাৎ কর্মচারীকে হাতে করে প্রতিটি অঙ্ক বের করে নতুন বেতন বসানোর পরিবর্তে, সিস্টেমের প্রদর্শিত হিসাব ধাপে ধাপে যাচাই করার সুযোগ থাকছে।
৬ষ্ঠ ট্যাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পে-ফিকেশনের পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬’ সংক্রান্ত ৬ষ্ঠ ট্যাব।
প্রদর্শিত স্ক্রিনে এই অংশে নতুন গ্রেড, বেতনস্কেলের সীমা এবং ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের হিসাব দেখা যাচ্ছে।
এখানেই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন বেসিক কত হবে, সেটি সিস্টেমে নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী দৃশ্যমান হওয়ার কথা।
অর্থাৎ কর্মচারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে—৬ষ্ঠ ট্যাবে প্রদর্শিত নতুন বেতনটি নিজের চাকরির তথ্য ও প্রাপ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
২০২৭ সালের হিসাবও পরবর্তী অংশে থাকবে
স্ক্রিনে ০১-০১-২০২৭ তারিখের একটি পরবর্তী ধাপও দেখা যাচ্ছে। সেখানে পরবর্তী ১৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির হিসাবের উল্লেখ রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, নতুন বেতনস্কেল কার্যকরের পরবর্তী নির্ধারিত ধাপের হিসাবও পে-ফিকেশন কাঠামোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে দেখানো হচ্ছে।
ফলে শুধু ১ জুলাই ২০২৬-এর বেতন নয়, পরবর্তী নির্ধারিত সময়ের বেতন বৃদ্ধির হিসাবও কর্মচারী পে-ফিকেশন রিপোর্টে দেখতে পারবেন।
কর্মচারীকে নতুন করে কত তথ্য দিতে হবে?
পে-ফিকেশন নিয়ে কর্মচারীদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো—তাদের কি পুরোনো চাকরির সব তথ্য আবার নতুন করে টাইপ করতে হবে?
প্রদর্শিত কাঠামো থেকে বোঝা যায়, নতুন করে বিপুল পরিমাণ তথ্য এন্ট্রি করার প্রয়োজন নেই। সিস্টেমে থাকা তথ্যের বড় অংশ আগে থেকেই প্রদর্শিত হতে পারে। কর্মচারীর মূল কাজ হবে তথ্যগুলো ভালোভাবে যাচাই করা এবং যেসব জায়গায় প্রয়োজন সেখানে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রদান করা।
এ কারণে পে-ফিকেশনকে শুধু ‘ডাটা এন্ট্রি’ হিসেবে না দেখে তথ্য যাচাই ও চূড়ান্ত অনুমোদনের একটি ধাপভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
স্বয়ংক্রিয় তথ্য ভুল হলে কী করবেন?
সিস্টেমে কোনো তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হলে সেটি নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তনের সুযোগ নাও থাকতে পারে।
যেমন—পূর্ববর্তী বেতন, চাকরির রেকর্ড, ইনক্রিমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য ভুল থাকলে কর্মচারী নিজে সেটি পরিবর্তন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টস/হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব নিয়ে সন্দেহ হলে সরাসরি পরিবর্তন না করে আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা উচিত।
Final Submit-এর আগে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা
পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ার শেষ দিকে আসবে চূড়ান্ত সাবমিশন।
Final Submit করার আগে কর্মচারীর উচিত অন্তত নিচের বিষয়গুলো যাচাই করা—
- নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য;
- পদ ও গ্রেড;
- চাকরিতে যোগদানের তথ্য;
- বর্তমান ও পূর্ববর্তী কর্মস্থলের তথ্য;
- পূর্ববর্তী বেতন;
- ইনক্রিমেন্টের তথ্য;
- উচ্চতর গ্রেড/পদোন্নতির তথ্য;
- ১ জুলাই ২০২৬-এর নতুন বেসিক;
- পরবর্তী বেতন বৃদ্ধির হিসাব;
- অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য।
Final Submit হয়ে গেলে নিজের পক্ষ থেকে তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই সাবমিটের আগে সম্পূর্ণ তথ্য পুনরায় পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ
পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ার শেষ দিকে পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যের একটি অংশ রয়েছে। সেখানে কর্মজীবনের ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কর্মচারী কর্মজীবনে একাধিক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের প্রথম কর্মস্থল থেকে বর্তমান কর্মস্থল পর্যন্ত চাকরির ইতিহাস সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখা সুবিধাজনক হবে।
এখানে কোনো তথ্য বাদ পড়লে পরবর্তী পর্যায়ে তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই পুরোনো নিয়োগপত্র, বদলি/পদায়ন আদেশ, যোগদানপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চাকরির নথি হাতের কাছে রাখা ভালো।
Report অপশনে পাওয়া যাবে পে-ফিকেশন বিবরণী
সব ধাপ সম্পন্ন করার পর Report অপশনের মাধ্যমে পে-ফিকেশনের বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখা ও প্রিন্ট করার সুযোগ থাকবে।
এই রিপোর্টে নতুন বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিক হিসাব সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টস অফিসের ভেরিফিকেশন নম্বর পাওয়ার বিষয়টিও পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে Final Submit-এর পর কর্মচারীর উচিত রিপোর্টটি সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে প্রিন্ট কপি রাখা।
পে-ফিকেশনের আগে যেসব তথ্য প্রস্তুত রাখবেন
কাজটি আরও সহজ করতে কর্মচারীরা আগে থেকেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রস্তুত রাখতে পারেন।
১. বর্তমান মূল বেতন
২. ৩০ জুন ২০২৬-এর বেতন সংক্রান্ত তথ্য
৩. ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্টের তথ্য
৪. পদ ও বর্তমান গ্রেড
৫. পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেড বা পদোন্নতির তথ্য
৬. চাকরিতে যোগদানের তারিখ
৭. পূর্ববর্তী কর্মস্থলের তথ্য
৮. বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য
৯. প্রয়োজনীয় চাকরির আদেশ ও রেকর্ড
১০. পেনশন/চাকরির ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয় তথ্য।
এসব তথ্য হাতে থাকলে আইবাস++-এ প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে দেখা যাবে।
পে-ফিকেশন নিয়ে আতঙ্কের চেয়ে সতর্কতা বেশি জরুরি
সবকিছু মিলিয়ে আইবাস++ পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—কর্মচারীকে পুরো বেতন হিসাব হাতে করে করতে হবে না।
আগের বেতন ও চাকরির তথ্যের ভিত্তিতে সিস্টেমে ধাপে ধাপে নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব প্রদর্শিত হবে। কর্মচারীর কাজ মূলত তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় ঘর পূরণ, প্রতিটি ধাপে Save & Continue এবং সবশেষে Final Submit করা।
বিশেষ করে ৬ষ্ঠ ধাপে জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী নতুন বেসিক এবং ৭ম ধাপে সারসংক্ষেপ/চূড়ান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
আইবাস++-এর পে-ফিকেশন প্রক্রিয়াকে জটিল মনে হলেও ধাপে ধাপে এগোলে কাজটি তুলনামূলকভাবে সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্য না বুঝে পরিবর্তন না করা এবং Final Submit-এর আগে পুরো হিসাব ভালোভাবে যাচাই করা।
কোনো স্বয়ংক্রিয় তথ্য ভুল মনে হলে নিজে পরিবর্তনের চেষ্টা না করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ। আর Final Submit করার আগে নতুন বেসিক, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও চাকরির ধারাবাহিক তথ্য একবার নয়—প্রয়োজনে একাধিকবার যাচাই করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।




