জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পে-ফিক্সেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হলো—১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে এবং নতুন স্কেলের বর্ধিত মূল বেতন কোন সময়ে কতটুকু কার্যকর হবে। প্রকাশিত গেজেটের তথ্য, সাম্প্রতিক সরকারি-বিষয়ক প্রতিবেদন এবং পাঠকের দেওয়া পে-ফিক্সেশন চার্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত বেতন বৃদ্ধি—দুটি পৃথক বিষয় হিসেবে হিসাব করতে হবে। fileciteturn0file0L7-L10
১ জুলাই ২০২৬ থেকেই বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হিসাব
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই। গেজেটভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী প্রথমে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্য চাকরির মেয়াদ পূরণের শর্তও রয়েছে।
অর্থাৎ, ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্টকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত আটকে রাখার বিষয়টি নেই। পে-ফিক্সেশনের সময় প্রযোজ্য হলে ওই ইনক্রিমেন্ট হিসাবের মধ্যে যুক্ত হবে।
আপলোড করা চার্টেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেখানে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর “বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিসহ (ইনক্রিমেন্ট) মূল বেতন” হিসেবে ৪২,৯০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
কিন্তু নতুন পে-স্কেলের ১০০% বৃদ্ধি একদিনে নয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও নতুন স্কেলের অতিরিক্ত মূল বেতন পুরোটা একই দিনে কার্যকর হচ্ছে না। গেজেট অনুযায়ী, গ্রেডভেদে অতিরিক্ত মূল বেতনের একটি অংশ প্রথম ধাপে, পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং পূর্ণ সুবিধা তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে।
গ্রেড ১০ থেকে ২০-এর ক্ষেত্রে—
- ১ জুলাই–৩১ ডিসেম্বর ২০২৬: নতুন বেতন বৃদ্ধির ৫০%
- ১ জানুয়ারি–৩০ জুন ২০২৭: মোট বৃদ্ধির ৭৫%
- ১ জুলাই ২০২৭ থেকে: মোট বৃদ্ধির ১০০%
অন্যদিকে গ্রেড ৯ ও তদূর্ধ্বের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৪০%, দ্বিতীয় ধাপে ৭০% এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ ১০০% বৃদ্ধির কাঠামো রয়েছে।
আপনার দেওয়া চার্টে গ্রেড–১০-এর হিসাব
আপলোড করা চার্টটির শিরোনাম “জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ (সিভিল)” এবং এতে গ্রেড–১০-এর একটি উদাহরণ দেখানো হয়েছে। চার্ট অনুযায়ী ৩০ জুনের মূল বেতন থেকে শুরু করে নতুন স্কেলের প্রাথমিক ধাপ, পার্থক্য, নিকটবর্তী উচ্চতর ধাপ এবং ইনক্রিমেন্টসহ পরবর্তী বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদাহরণে হিসাবটি হলো—
বর্তমান মূল বেতন: ২৪,৮৭০ টাকা
নতুন স্কেলের প্রাথমিক ধাপ: ৩২,০০০ টাকা
পার্থক্য: ৮,৮৭০ টাকা
মোট: ৪০,৮৭০ টাকা
নিকটবর্তী উচ্চতর ধাপ: ৪০,৯০০ টাকা
বার্ষিক ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন: ৪২,৯০০ টাকা।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পে-ফিক্সেশনের মূল হিসাব শেষ হওয়ার পরও ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আলাদাভাবে বিবেচনায় এসেছে।
৫০% + ২৫% + ২৫%—এর অর্থ কী?
চার্টে পরবর্তী ধাপে বেতন বৃদ্ধির হিসাবকে তিন ভাগে দেখানো হয়েছে।
প্রথমে বেতন বৃদ্ধির ৫০% যোগ করা হয়েছে। এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৭-এ আরও ২৫% এবং ১ জুলাই ২০২৭-এ অবশিষ্ট ২৫% যোগ করে মোট ১০০% বর্ধিত মূল বেতনে পৌঁছানোর হিসাব দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ এখানে ৫০% + ২৫% + ২৫% যোগ করলে মোট ১০০% হয়।
চার্টের শেষ ধাপে “চূড়ান্ত প্রাপ্য মূল বেতন ১০০%” হিসেবে ৪৫,১০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এটি গ্রেড–১০ থেকে ২০-এর সরকারি বাস্তবায়ন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—প্রথম ধাপে ৫০%, দ্বিতীয় ধাপে মোট ৭৫% এবং তৃতীয় ধাপে ১০০%।
পে-ফিক্সেশনের পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে
একজন গ্রেড–১০ কর্মচারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি সহজভাবে এভাবে বোঝা যায়—
ধাপ–১: ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর বিদ্যমান মূল বেতন নির্ধারণ।
ধাপ–২: পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে তাঁর মূল বেতনের পার্থক্য নির্ণয়।
ধাপ–৩: ওই পার্থক্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক ধাপের সঙ্গে যোগ।
ধাপ–৪: যোগফল যদি নতুন স্কেলের কোনো ধাপের সঙ্গে মিলে যায়, সেই ধাপে বেতন নির্ধারণ; না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ।
ধাপ–৫: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করা।
ধাপ–৬: এরপর নতুন স্কেলের বর্ধিত বেতনের বাস্তবায়ন হার অনুযায়ী প্রথম ধাপের বেতন নির্ধারণ।
সরকারি গেজেটভিত্তিক ব্যাখ্যাতেও নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুনের বিদ্যমান মূল বেতন, পুরোনো স্কেলের প্রাথমিক ধাপ এবং নতুন স্কেলের অনুরূপ ধাপের মধ্যে পার্থক্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্ট বনাম নতুন স্কেলের বৃদ্ধি
দুটি বিষয় পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি আরও পরিষ্কার হয়:
| বিষয় | কার্যকর হওয়ার কাঠামো |
|---|---|
| বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট | ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রযোজ্য হলে হিসাব হবে |
| নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ | ১ জুলাই ২০২৬ |
| গ্রেড ১০–২০-এর বর্ধিত বেতন | প্রথমে ৫০% |
| ১ জানুয়ারি ২০২৭ | মোট বৃদ্ধির ৭৫% |
| ১ জুলাই ২০২৭ | পূর্ণ ১০০% বর্ধিত মূল বেতন |
| অন্যান্য সংশোধিত ভাতা | অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে |
নতুন পে-স্কেলের গেজেট কার্যকর হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এবং বেতন বৃদ্ধির বকেয়া ওই তারিখ থেকে গেজেট জারির তারিখ পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথাও সরকারি তথ্য ও প্রতিবেদনে এসেছে।
পে-ফিক্সেশনে ৩০ জুনের বেতন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গেজেটের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত যে কর্মচারী যে বর্তমান স্কেল বা উচ্চতর গ্রেডে বেতন পেয়ে আসছিলেন, ১ জুলাই থেকে তাঁর জন্য সংশ্লিষ্ট নতুন স্কেলের অনুরূপ স্কেল প্রযোজ্য হবে।
এ কারণে একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ভিন্ন হলে পে-ফিক্সেশনের পর তাঁদের নতুন মূল বেতনও ভিন্ন হতে পারে।
আইবাস++ পে-ফিক্সেশনে কী গুরুত্ব পাবে?
নতুন পে-স্কেলের বেতন নির্ধারণ অনলাইনে iBAS++ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। গেজেট-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইনে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে।
ফলে পে-ফিক্সেশনের সময় কয়েকটি তথ্য বিশেষভাবে সঠিক থাকা প্রয়োজন—
- ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন
- বর্তমান গ্রেড ও স্কেল
- প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট
- ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্টের হিসাব
- নতুন স্কেলের অনুরূপ ধাপ
- সংশ্লিষ্ট ধাপে কার্যকর বেতন বৃদ্ধির শতাংশ।
বকেয়া বেতনেও প্রভাব পড়বে
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হলেও গেজেট প্রকাশ হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। ফলে ১ জুলাই থেকে গেজেট জারির তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্য বেতন পার্থক্য বকেয়া হিসেবে হিসাবের আওতায় আসবে। তবে এর সঙ্গে আগে দেওয়া বিশেষ সুবিধা সমন্বয়ের বিধানও রয়েছে।
এ কারণে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর শুধু নতুন মূল বেতন নয়, জুলাই থেকে প্রাপ্য বেতন পার্থক্য এবং সংশ্লিষ্ট সমন্বয়ও হিসাবের মধ্যে আসবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ নিয়ে বর্তমানে যে বিভ্রান্তিটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, সেটি হলো—“১ জুলাই থেকে ইনক্রিমেন্ট কার্যকর” কথাটিকে কেউ কেউ “১ জুলাই থেকেই নতুন স্কেলের ১০০% বেতন বৃদ্ধি কার্যকর” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
দুটি বিষয় এক নয়।
১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রযোজ্য কর্মচারীর পে-ফিক্সেশনে যুক্ত হবে। অন্যদিকে নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট গ্রেডে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ ১০০% বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে।
আপলোড করা গ্রেড–১০-এর উদাহরণেও একই কাঠামো দেখা যায়—প্রথমে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ, এরপর ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে ৫০% + ২৫% + ২৫% ধাপে পূর্ণ ১০০% বর্ধিত বেতনে পৌঁছানোর হিসাব দেখানো হয়েছে।
শেষ কথা
Pay Fixation 2026-এর ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন পে-স্কেলের বেতন বৃদ্ধি—এই দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে। ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পে-ফিক্সেশনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও নতুন স্কেলের সম্পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন একদিনে কার্যকর হচ্ছে না; গ্রেডভেদে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ বর্ধিত বেতন কার্যকর হওয়ার কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
সুতরাং, পে-ফিক্সেশনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো: ৩০ জুনের মূল বেতন → নতুন স্কেলে ফিক্সেশন → ১ জুলাইয়ের প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট → সংশ্লিষ্ট ধাপের বেতন বৃদ্ধি।




