নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে পে-ফিক্সেশন, পূর্বের ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেড এবং বিএড স্কেল নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একই গ্রেডে থাকা অবস্থায় পাওয়া বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নতুন বেতন নির্ধারণে কীভাবে বিবেচিত হবে—এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সুবিধার আওতায় থাকবেন বলে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে ‘আগে পাওয়া সব ইনক্রিমেন্ট আলাদাভাবে নতুন গ্রেডে যোগ হবে’—এভাবে বিষয়টি বোঝা ঠিক নয়। নতুন পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মূল বেতন, বিদ্যমান গ্রেড/স্কেল এবং নতুন স্কেলের অনুরূপ বেতনক্রম।
৩০ জুনের মূল বেতনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
নতুন পে-স্কেলের পে-ফিক্সেশনে শুধু গ্রেড জানলেই নতুন বেতন নির্ধারণ করা যাবে না। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে শিক্ষক বা কর্মচারীর প্রকৃত মূল বেতন কত ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই গ্রেডে থাকা দুজনের একজন যদি কয়েকটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন এবং অন্যজন কম ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে ৩০ জুন তাঁদের মূল বেতন ভিন্ন হতে পারে। ফলে নতুন স্কেলেও তাঁদের ফিক্সড বেতন একই হবে না।
অর্থাৎ, পুরোনো ইনক্রিমেন্টের অর্থকে নতুন স্কেলে আলাদা করে একের পর এক যোগ করার বদলে ৩০ জুনের নির্ধারিত মূল বেতনকে ভিত্তি করে নতুন স্কেলে ফিক্সেশন করা হবে।
তাহলে আগে পাওয়া ইনক্রিমেন্টের সুবিধা কোথায়?
একজন শিক্ষক একই গ্রেডে কয়েক বছর চাকরি করে একাধিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকলে তাঁর ৩০ জুনের মূল বেতন স্বাভাবিকভাবেই ওই গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের চেয়ে বেশি হতে পারে।
নতুন পে-স্কেলে ফিক্সেশনের সময় সেই ৩০ জুনের বিদ্যমান মূল বেতন বিবেচনায় আসবে। তাই আগের ইনক্রিমেন্টের কারণে ৩০ জুনে মূল বেতন যতটা বেশি ছিল, সেটিই নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাবকে প্রভাবিত করবে।
জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্ট কি বিবেচনায় আসবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ ১ জুলাই নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির বিধানও রয়েছে।
তাই জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্য কি না এবং ফিক্সেশনে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর ৩০ জুনের অবস্থা, ইনক্রিমেন্টের যোগ্যতা এবং প্রযোজ্য এমপিও/বেতন নির্ধারণের বিধানের ওপর নির্ভর করবে। শুধু ‘জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট পেয়েছি’ বলেই সেটি নতুন গ্রেডে পৃথকভাবে যোগ হবে—এমন সরল নিয়ম ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে গেলে কী হবে?
এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেমন কোনো এমপিওভুক্ত সহকারী মৌলভী বর্তমানে ১১তম গ্রেডে আছেন এবং পরবর্তীতে বিএড/প্রযোজ্য যোগ্যতার ভিত্তিতে ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পান—তাহলে ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সময় ১১তম গ্রেডের পুরোনো ইনক্রিমেন্টগুলোকে ‘১০ম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট’ হিসেবে গণনা করা যাবে না।
কারণ ১০ম গ্রেডে যাওয়ার পর নতুন গ্রেডের বেতন নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি/উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন বিধান প্রযোজ্য হবে।
এখানেই অনেকের প্রশ্নের সঙ্গে বাস্তব হিসাবের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন শিক্ষক ১১তম গ্রেডে কয়েক বছর চাকরি করেছেন। এ সময় তিনি ১১তম গ্রেডে কয়েকটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন।
পরে তিনি ১০ম গ্রেডে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেন।
এ ক্ষেত্রে তাঁর আগের ১১তম গ্রেডের ইনক্রিমেন্টকে ১০ম গ্রেডে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট হিসেবে দেখানো যাবে না। বরং ১০ম গ্রেডে যাওয়ার তারিখে প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের নিয়ম অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ—
১১তম গ্রেডে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট ≠ ১০ম গ্রেডে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট।
এ কারণেই “আগে যত ইনক্রিমেন্ট পেয়েছি, সবগুলো নতুন গ্রেডে যোগ হবে”—এই ধারণাটি বিভ্রান্তিকর।
নভেম্বরে ১০ম গ্রেড হলে অক্টোবর পর্যন্ত কী হবে?
আরেকটি প্রশ্ন হলো—কোনো শিক্ষক যদি নভেম্বর মাসে ১০ম গ্রেডের সুবিধা পান, তাহলে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিনি কোন গ্রেডের বেতন পাবেন?
সাধারণভাবে ১০ম গ্রেডে যাওয়ার কার্যকর তারিখ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০ম গ্রেড যদি নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়, তাহলে তার আগের সময়ের বেতন এবং পরবর্তী সময়ের নতুন গ্রেডের বেতন পৃথকভাবে হিসাব করার বিষয় আসবে।
অর্থাৎ শুধু নভেম্বর মাসে ফিক্সেশন হওয়া মানেই জুলাই থেকে পুরো সময়ের জন্য ১০ম গ্রেডের বেতন ধরে নেওয়া যাবে না। কার্যকর তারিখ, অনুমোদনের তারিখ এবং ফিক্সেশনের বিধান দেখে হিসাব করতে হবে।
ফাযিল পাস সহকারী মৌলভীর ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেড কি স্বয়ংক্রিয়?
এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শুধু ফাযিল ডিগ্রি আছে বলেই প্রত্যেক সহকারী মৌলভী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে চলে যাবেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
১০ম গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এমপিও নীতিমালা, পদ, নিয়োগের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত/পেশাগত যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এমপিও নীতিমালায় উচ্চতর গ্রেডের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল ও অন্যান্য শর্তের বিধান রয়েছে।
বিএড স্কেলের আবেদন করলেও আগের ইনক্রিমেন্ট কি ১০ম গ্রেডে চলে যাবে?
এখানে একই যুক্তি প্রযোজ্য। কোনো শিক্ষক ১১তম গ্রেডে থাকা অবস্থায় বিএড স্কেলের জন্য আবেদন করলেন এবং পরবর্তীতে ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ হলো—তাহলে ১১তম গ্রেডে পাওয়া প্রতিটি ইনক্রিমেন্টকে ১০ম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট হিসেবে গণনা করা হবে না।
বরং ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের জন্য যে ফিক্সেশন বিধান প্রযোজ্য, সেটিই অনুসরণ করতে হবে।
পুরোনো স্কেল থেকে নতুন স্কেলে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রেও গেজেটে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পুরোনো মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট স্কেলের পার্থক্য বিবেচনা করে নতুন স্কেলের ধাপ নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
মূল কথা এক নজরে
| বিষয় | কীভাবে বুঝবেন |
|---|---|
| পুরোনো গ্রেডে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট | ৩০ জুনের মূল বেতনে প্রতিফলিত হবে |
| নতুন পে-স্কেলে ফিক্সেশন | ৩০ জুনের মূল বেতন ও প্রযোজ্য ফিক্সেশন বিধান গুরুত্বপূর্ণ |
| ১১তম গ্রেডে পাওয়া ইনক্রিমেন্ট | ১০ম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট হিসেবে সরাসরি গণনা হবে না |
| ১১তম থেকে ১০ম গ্রেড | নতুন গ্রেডে প্রযোজ্য ফিক্সেশন নিয়ম অনুসরণ করতে হবে |
| নভেম্বর থেকে ১০ম গ্রেড | কার্যকর তারিখ অনুযায়ী আগের ও পরের সময়ের বেতন নির্ধারণ হবে |
| জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট | যোগ্যতা ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী বিবেচিত হবে |
| ফাযিল ডিগ্রি | একাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ম গ্রেড নিশ্চিত করে না |
| বিএড স্কেল | অনুমোদন/কার্যকর তারিখ ও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ হবে |
শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে “কতটি ইনক্রিমেন্ট পেয়েছি”—এই তথ্যটি একা যথেষ্ট নয়। সঠিক হিসাবের জন্য অন্তত চারটি তথ্য প্রয়োজন—
১. ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মূল বেতন কত ছিল
২. ওই তারিখে কোন গ্রেডে ছিলেন
৩. কোন তারিখে উচ্চতর/নতুন গ্রেড কার্যকর হয়েছে
৪. সংশ্লিষ্ট গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সময় কোন ফিক্সেশন বিধান প্রযোজ্য
কারণ নতুন স্কেলে একই গ্রেডের সবার বেতন এক হবে না; ৩০ জুনের মূল বেতন এবং পে-ফিক্সেশনের নিয়ম অনুযায়ী নতুন স্কেলের ধাপ নির্ধারিত হবে।
সুতরাং, “আগে পাওয়া সব ইনক্রিমেন্ট নতুন গ্রেডে আবার যোগ হবে”—এমন ধারণার পরিবর্তে বলা বেশি সঠিক যে, পূর্বের ইনক্রিমেন্টে ৩০ জুনের মূল বেতন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেই মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট ফিক্সেশন বিধানই নতুন বেতন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এমপিও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেড, বিএড স্কেল ও ইনক্রিমেন্টের বিষয়টি আলাদা বিধানেও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে—তাই ব্যক্তিভেদে একই প্রশ্নের হিসাবও ভিন্ন হতে পারে। অতীতেও এমপিও শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড ও বিএড স্কেল পাওয়ার পর ইনক্রিমেন্ট নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতার নজির রয়েছে।




