জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান মূল বেতন, নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন এবং সংশ্লিষ্ট ধাপের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পদোন্নতি, ছুটিতে থাকা, সাময়িক বরখাস্ত, অবসর-উত্তর ছুটি এবং একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরতদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়েও নতুন বিধান সামনে এসেছে।
নতুন নিয়মের বাস্তব প্রয়োগে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—বর্তমান বেতন থেকে নতুন স্কেলে কর্মচারীর বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং নির্ধারিত অঙ্কটি যদি নতুন বেতনস্কেলের কোনো ধাপে না থাকে, তাহলে কোন ধাপ প্রযোজ্য হবে।
২০তম গ্রেডে ১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন হলে নতুন বেতন কত?
বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে সহজে বোঝা যায়। কোনো কর্মচারী ২০তম গ্রেডে বর্তমানে ১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন পেলে এবং পুরোনো ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৮,২৫০ টাকা ধরা হলে প্রথমে বর্তমান প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতনের পার্থক্য বের করতে হবে।
হিসাব:
বর্তমান মূল বেতন = ১১,৬৫০ টাকা
বর্তমান গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন = ৮,২৫০ টাকা
পার্থক্য = ১১,৬৫০ − ৮,২৫০
= ৩,৪০০ টাকা
নতুন বেতনস্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন যদি ২০,০০০ টাকা হয়, তাহলে এই পার্থক্য যোগ করলে পাওয়া যায়—
২০,০০০ + ৩,৪০০
= ২৩,৪০০ টাকা
কিন্তু নতুন বেতনস্কেলে যদি ২৩,৪০০ টাকা কোনো নির্ধারিত ধাপ না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তার পরবর্তী উচ্চতর নির্ধারিত ধাপে বেতন বসাতে হবে। প্রদত্ত স্কেল অনুযায়ী ২৩,৪০০ টাকার পরবর্তী ধাপ ২৪,৮০০ টাকা।
অর্থাৎ এই উদাহরণে কর্মচারীর নতুন মূল বেতন হবে—
১১,৬৫০ টাকা → ২৪,৮০০ টাকা
এখানে উল্লেখ্য, এটি শুধু মূল বেতন। এর সঙ্গে প্রযোজ্য বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য ভাতা যোগ হলে মোট প্রাপ্য বেতন আরও বাড়বে।
১ জুলাই ২০২৬-এর পর পদোন্নতি হলে কী হবে?
নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কোনো কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে নতুন উচ্চতর বেতনস্কেলের পদে পদোন্নতি না পেলে তার বেতন প্রথমে নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। এরপর পদোন্নতি হলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পরবর্তী বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
অর্থাৎ নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ এবং পরবর্তী পদোন্নতির কারণে বেতন পুনর্নির্ধারণ—দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।
১ জুলাই ছুটিতে থাকলে বেতন নির্ধারণ কীভাবে হবে?
কোনো কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ছুটিতে থাকলেও তার বেতন জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ছুটিতে থাকা অবস্থায় নতুন বেতনস্কেলের কারণে প্রতিটি আর্থিক সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। ছুটির সময় কর্মচারী যে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন, সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী সেটি আলাদাভাবে নির্ধারিত হতে পারে।
ফলে ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণ এবং ছুটিকালীন আর্থিক সুবিধা—এই দুই বিষয়কে পৃথকভাবে দেখতে হবে।
সাময়িক বরখাস্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান
১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারী যদি সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকেন, তাহলে পুনর্বহালের আগে তার নতুন বেতনস্কেলে বেতন নির্ধারণ না করার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকা কর্মচারীর ক্ষেত্রে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি স্থগিত থাকবে। পরবর্তীতে পুনর্বহাল হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী তার বেতন নির্ধারণ করা হবে।
অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের জন্য কী হবে?
১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারী যদি অবসর-উত্তর ছুটিতে (PRL) থাকেন, তাহলে তার পেনশন নির্ধারণের উদ্দেশ্যে নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।
এর ফলে অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের পেনশনযোগ্য বেতন নির্ধারণে নতুন বেতনস্কেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই পদে ৮ বছর পূর্ণ হলে উচ্চতর গ্রেড
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ।
কোনো স্থায়ী কর্মচারী একই পদে পদোন্নতি ছাড়া ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করলে এবং তার চাকরি সন্তোষজনক হলে নির্দিষ্ট শর্তে পরবর্তী অর্থবছর/৯ম বছরে সংশ্লিষ্ট পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো—দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত থেকেও পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়া কর্মচারীদের আর্থিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করা।
তবে ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে কারও ৮ বছর পূর্ণ হয়ে থাকলে তার ক্ষেত্রে নতুন বিধানের রূপান্তর সংক্রান্ত নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য হবে। ফলে শুধু চাকরির বয়স দেখেই প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একইভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রযোজ্য হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর আরও ৬ বছর
একই পদে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও যদি কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে কর্মরত থাকেন, তাহলে আরও ৬ বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ কাঠামোটি মোটামুটি এমন—
একই পদে ৮ বছর → প্রথম উচ্চতর গ্রেড
প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর আরও ৬ বছর → পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড
তবে উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট শর্ত, চাকরি সন্তোষজনক হওয়া, পূর্বে প্রাপ্ত সুবিধা এবং গ্রেডসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করতে হবে।
উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা সর্বোচ্চ কতদূর?
উচ্চতর গ্রেডের এই আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে ৮ম গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্যতার সীমা রয়েছে।
অর্থাৎ কোনো কর্মচারী এই ব্যবস্থার আওতায় ৮ম গ্রেড পর্যন্ত উচ্চতর আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু ৮ম থেকে ৪র্থ গ্রেডের মধ্যে কোনো কর্মচারী এই সুবিধা গ্রহণ করে থাকলে একই ব্যবস্থায় পুনরায় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এ কারণে উচ্চতর গ্রেডের হিসাব করার সময় শুধু চাকরির মেয়াদ নয়, কর্মচারী ইতিপূর্বে কোন কোন গ্রেড বা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন—সেটিও যাচাই করতে হবে।
আগে সিলেকশন গ্রেড বা টাইমস্কেল পেলে কী হবে?
একই পদে কর্মরত কোনো কর্মচারী যদি পূর্বেই সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল বা উচ্চতর গ্রেড একাধিকবার পেয়ে থাকেন, তাহলে নতুন নিয়মে আবার অতিরিক্ত উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকবে।
অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার পর প্রত্যেক কর্মচারীকে নতুন করে ৮ বছর ও ৬ বছরের সুবিধা দেওয়া হবে—বিষয়টি এতটা সরল নয়।
কর্মচারীর পূর্ববর্তী চাকরিজীবনে পাওয়া আর্থিক সুবিধাগুলোর রেকর্ডও বিবেচনায় নিতে হবে।
পদোন্নতির সুযোগ নেই—এমন Blocked পদের কর্মচারীরাও সুবিধা পাবেন?
নতুন ব্যবস্থায় Blocked পদ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক Blocked হিসেবে ঘোষিত এবং যেখানে পদোন্নতির সুযোগ নেই, এমন পদে কর্মরত কর্মচারীদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ইতোমধ্যে এ ধরনের উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকেন, তাহলে একই কারণে আবার নতুন করে সেই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বেতন নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ধাপ নির্বাচন
নতুন বেতনস্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান মূল বেতনকে নতুন স্কেলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই হবে না। প্রথমে পুরোনো স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন থেকে কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতনের অতিরিক্ত অংশ বের করতে হবে।
এরপর নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে ওই অতিরিক্ত অংশ যোগ করতে হবে। প্রাপ্ত অঙ্কটি যদি নতুন স্কেলের নির্ধারিত কোনো ধাপের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সেই ধাপ প্রযোজ্য হবে। আর যদি নির্ধারিত ধাপের মাঝামাঝি কোনো অঙ্ক পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
উপরের উদাহরণে—
বর্তমান মূল বেতন: ১১,৬৫০ টাকা
পুরোনো প্রারম্ভিক বেতন: ৮,২৫০ টাকা
অতিরিক্ত অংশ: ৩,৪০০ টাকা
নতুন প্রারম্ভিক বেতন: ২০,০০০ টাকা
হিসাবকৃত বেতন: ২৩,৪০০ টাকা
পরবর্তী নির্ধারিত ধাপ: ২৪,৮০০ টাকা
সুতরাং উদাহরণ অনুযায়ী নতুন মূল বেতন ২৪,৮০০ টাকা।
কর্মচারীদের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ কার্যকরের পর একই গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন জানা যথেষ্ট নয়। প্রত্যেক কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, পুরোনো স্কেলের ধাপ, চাকরির মেয়াদ, পূর্বে পাওয়া উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড, পদোন্নতির ইতিহাস এবং ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে কর্মস্থল বা ছুটির অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৮ বছর ও পরবর্তী ৬ বছরের উচ্চতর গ্রেডের বিধানটি গুরুত্বপূর্ণ। আবার যারা আগে থেকেই একাধিক আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
সারসংক্ষেপ
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল কাঠামো হলো—১ জুলাই ২০২৬-কে ভিত্তি ধরে বর্তমান বেতন নতুন স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় করা, নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী নতুন মূল বেতন বসানো এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা নির্ধারণ করা।
তবে বাস্তবে কারও বেতন কত হবে তা নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, নিয়োগ/পদোন্নতির ইতিহাস এবং পূর্বে পাওয়া আর্থিক সুবিধা যাচাই করা জরুরি। কারণ একই গ্রেডে থেকেও চাকরির ইতিহাস ভিন্ন হলে নতুন বেতন নির্ধারণের ফলও ভিন্ন হতে পারে।

