সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন আর্থিক সুরক্ষা ও সঞ্চয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ‘সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল’ বা জিপিএফ (General Provident Fund)। তবে এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার, চাঁদা কর্তনের হার, অগ্রিম উত্তোলন এবং চূড়ান্ত বিল নিষ্পত্তির বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাবে অনেক সময় কর্মচারীদের নানাবিধ জটিলতায় পড়তে হয়। জিপিএফ সংক্রান্ত হিসাবরক্ষণ ও সরকারি বিধিবিধানের আলোকে তহবিলের বিস্তারিত নিয়মাবলী নিচে তুলে ধরা হলো:
১. যোগদান ও নমিনি সংক্রান্ত বিধান
-
যোগদানের যোগ্যতা: সরকারি চাকরিতে ২ বছর পূর্ণ হওয়ার পর জিপিএফ তহবিলে যোগদান করা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো কর্মচারী চাইলে চাকরির ২ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেও নিজ ইচ্ছায় এই তহবিলে যুক্ত হতে পারেন।
-
মনোনয়ন (নমিনি): জিপিএফ তহবিলে পরিবারের সদস্য ব্যতীত বহিরাগত কাউকে নমিনি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অবিবাহিত কর্মচারীরা পিতা, মাতা, ভাই বা বোনকে নমিনি হিসেবে দিতে পারেন।
-
নমিনি পরিবর্তন: বিবাহের পর পূর্বে প্রদান করা নমিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় এবং নতুন নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রীর (বা স্বামীর) নামে পরিবর্তন হয়। প্রয়োজনে কর্মচারী যেকোনো সময় বিধি মেনে নমিনি পরিবর্তন করতে পারেন।
২. চাঁদা ও সুদের হার
-
চাঁদা কর্তন: মূল বেতনের সর্বনিম্ন ৫% থেকে সর্বোচ্চ ২৫% পর্যন্ত জিপিএফ তহবিলে কর্তন করা যায়।
-
সুদের হার: বর্তমানে জিপিএফ তহবিলে জমা টাকার ওপর সুদের হার ১৩% নির্ধারিত রয়েছে।
-
মাঝপথে চাঁদা পরিবর্তন: সাধারণত একটি অর্থবছরের মাঝখানে জিপিএফ-এর কর্তনের হার কমানো বা বাড়ানো যায় না, তবে বিশেষ ও যৌক্তিক পেক্ষাপটে তা পরিবর্তন করা সম্ভব।
৩. জিপিএফ অগ্রিম গ্রহণ ও মঞ্জুরি
-
অগ্রিমের সীমা: কর্মকালীন সময়ে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ৪টি অফেরতযোগ্য বা ফেরতযোগ্য অগ্রিম উত্তোলন করা যায়। তবে কর্মচারীর বয়স ৫২ বছর পূর্ণ হলে অফেরতযোগ্য অগ্রিম গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা বা সীমা থাকে না।
-
মঞ্জুরির প্রক্রিয়া: কর্মচারীকে নিজ প্রশাসনিক অফিসে আবেদন করতে হয়। ‘ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল পাওয়ার’ (Delegation of Financial Power) অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা শেষে অগ্রিম মঞ্জুর করে থাকেন।
-
অর্থ পরিশোধ: মঞ্জুরিপত্র সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে (CAO/DAO) পাঠানো হলে তারা নোটে বিস্তারিত উল্লেখ করে বিলের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন।
৪. কর্তন, চালানের বিধান ও কর সুবিধা
-
কিস্তিতে আদায়: উত্তোলিত অগ্রিম টাকা কোনোভাবেই ব্যাংকিং চালানের মাধ্যমে সরাসরি জমা দেওয়া যায় না; তা প্রতি মাসের বেতন বিল হতে নির্দিষ্ট কিস্তিতে আদায় করা হয়।
-
সুদের সমন্বয়: উত্তোলিত অগ্রিমের টাকা মূল স্থিতি (Balance) থেকে বিয়োগ বা সমন্বয় করা হয়, যার ফলে উত্তোলিত অর্থের ওপর পরবর্তী মাসের বেতন থেকে কোনো সুদ প্রাপ্য হয় না।
-
আয়কর সুবিধা: অগ্রিম উত্তোলনের পর তা বেতন থেকে পুনঃকর্তন করা হলেও ওই অর্থ আয়কর রিটার্নে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয় এবং কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়।
-
স্থিতি হ্রাসের কারণ: জিপিএফ স্থিতি থেকে উত্তোলিত টাকা বিয়োগ হওয়ার কারণেই প্রতি মাসে একই হারে চাঁদা কর্তন করা হলেও সাময়িকভাবে মোট স্থিতি কমে যায়।
৫. চূড়ান্ত উত্তোলন (Final Withdrawal) প্রক্রিয়া
চাকরিজীবনের শেষে বা অবসরে যাওয়ার পর জিপিএফ-এর জমানো পুরো অর্থ উত্তোলনের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়:
-
নির্ধারিত ৬৬৩ নং ফরম সঠিকভাবে পূরণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে হবে।
-
সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস (CAO/DAO) আবেদনের ভিত্তিতে মূল জমা ও অর্জিত সুদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব সম্পন্ন করে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য জিপিএফ তহবিলের এসব নিয়মকানুন যথাযথভাবে মেনে চলা ও নিয়মিত লেজার স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে অবসরকালীন সময়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই প্রাপ্য অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।




