জাতীয় বেতন কাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন কাঠামোর পর ২০১৫ ও ২০২৬ সালের বেতন স্কেলে বেতন সমতাকরণ এবং পদোন্নতির পর মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসংগতি দেখা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যথাযথ সমন্বয় না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম জ্যেষ্ঠ কর্মচারী বেশি মূল বেতন পেতে পারেন, যা দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি তুলনামূলক হিসাবচিত্রে দুই কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা তুলে ধরে বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। কর্মচারীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং বেতন নির্ধারণে কোনো প্রকৃত অসংগতি থাকলে তা সংশোধন করবে।
পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশিত হিসাবচিত্র অনুযায়ী, কমল নামের একজন কর্মচারী ১৫তম গ্রেডে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, সজল নামের আরেক কর্মচারী ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ১১তম গ্রেডে উন্নীত হন। ছবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পদোন্নতির পর সজলের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা।
এরপর কয়েক বছরের বেতন বৃদ্ধির হিসাব পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জুলাই কমলের মূল বেতন দেখানো হয়েছে ২২ হাজার ৩৭০ টাকা এবং সজলের ২২ হাজার ৫৩০ টাকা। অর্থাৎ, উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে সজলের মূল বেতন কমলের চেয়ে ১৬০ টাকা বেশি ছিল।
তবে ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছবিতে ভিন্ন চিত্র দেখানো হয়েছে। সেখানে ২০২৬ সালের ১ জুলাই কমলের মূল বেতন ৩৯ হাজার টাকা এবং সজলের ৩৭ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের সম্ভাব্য হিসাবেও কমলের মূল বেতন ৪১ হাজার টাকা এবং সজলের ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এই তুলনামূলক হিসাবের মাধ্যমে বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতা ও সমতাকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে উল্লিখিত অঙ্কগুলো সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তাই এগুলোকে চূড়ান্ত বা সর্বজনীন বেতন নির্ধারণের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বেতন সমতাকরণ?
সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল বেতন, গ্রেড, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং প্রযোজ্য বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন কর্মচারীর পদোন্নতির পর বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, নতুন গ্রেডে কোন ধাপ প্রযোজ্য হবে এবং পূর্ববর্তী মূল বেতনের সঙ্গে নতুন স্কেলের সামঞ্জস্য কীভাবে রক্ষা করা হবে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভরশীল।
কোনো কর্মচারী দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন করলে তাঁর মূল বেতন নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বাড়তে পারে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত কম সময় চাকরি করা কোনো কর্মচারী পদোন্নতি পেলে তাঁর বেতন নতুন গ্রেডের বিধান অনুযায়ী পুনর্নির্ধারিত হতে পারে। ফলে শুধু চাকরির মেয়াদ বা পদবির ভিত্তিতে দুই কর্মচারীর বেতন তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র সব সময় স্পষ্ট হয় না।
তবে একই ধরনের পদ, প্রযোজ্য একই বিধান এবং তুলনীয় চাকরির অবস্থার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মচারী যদি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কম বেতন পান, তাহলে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণে কোনো ভুল, বিধির ভিন্ন প্রয়োগ অথবা সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নথিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
২০০৯, ২০১৫ ও ২০২৬ সালের বেতন কাঠামোর সমন্বয় কেন জরুরি?
একাধিক বেতন কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পুরোনো মূল বেতনকে নতুন স্কেলের উপযুক্ত ধাপে স্থানান্তর করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ। এ ক্ষেত্রে কর্মচারীর সর্বশেষ অনুমোদিত মূল বেতন, ইনক্রিমেন্টের তারিখ, পদোন্নতির ইতিহাস এবং নতুন স্কেলের প্রযোজ্য নিয়ম বিবেচনা করতে হয়।
নতুন স্কেলের ধাপ ও আগের স্কেলের ধাপের মধ্যে সরাসরি মিল না থাকলে বেতন নির্ধারণের বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত ধাপ নির্বাচন করতে হয়। কোনো পর্যায়ে তথ্য ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে অথবা একই পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে নিয়ম প্রয়োগ করা হলে বেতন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তাই জাতীয় বেতন কাঠামো ২০২৬ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতা এবং পদোন্নতির প্রভাবও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
iBAS++ বেতন নির্ধারণে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সময় কোনো কর্মচারীর হিসাবে অসংগতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এবং বেতন নির্ধারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর আগের বেতন নির্ধারণী বিবরণী, পদোন্নতির আদেশ, ইনক্রিমেন্টের তথ্য এবং নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন পাশাপাশি মিলিয়ে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের নিয়ম একইভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, iBAS++ ব্যবস্থায় কোনো তথ্যগত বা সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিটি বেতন পার্থক্যকে সফটওয়্যারের ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্যের কারণ নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট বিধি ও চাকরির ইতিহাস বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সরকারের কাছে যেসব পদক্ষেপ প্রত্যাশিত
বেতন সমতাকরণ নিয়ে কর্মচারীদের উদ্বেগ দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
১. অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাই: যেসব ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মচারী তুলনীয় পদে কর্মরত কনিষ্ঠ কর্মচারীর চেয়ে কম মূল বেতন পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নথিপত্রের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা।
২. বেতন নির্ধারণের বিধি স্পষ্ট করা: পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন স্কেলে বেতন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজন হলে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া।
৩. প্রকৃত অসংগতি সংশোধন: যাচাইয়ে বেতন নির্ধারণের ভুল বা বিধিগত অসংগতি পাওয়া গেলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. আপত্তি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা: কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে আপত্তি জানানোর জন্য কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যাতে তাঁদের অভিযোগ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা যায়।
৫. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: বেতন নির্ধারণের কারণ এবং প্রযোজ্য বিধান সম্পর্কে কর্মচারীদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা
সরকারি কর্মচারীদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় বেতন নির্ধারণে কোনো অসংগতি থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতা এবং পদোন্নতির পর প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা সঠিকভাবে হিসাব করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে এবং প্রকৃত সমস্যা পাওয়া গেলে তা সমাধানের উদ্যোগ নেবে। এতে বেতন নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
উপসংহার
জাতীয় বেতন কাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের হিসাব যথাযথভাবে সমন্বয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মচারী তুলনীয় অবস্থায় থাকা কনিষ্ঠ কর্মচারীর চেয়ে কম মূল বেতন পেলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি ও বিধিমালার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে ছবিতে উপস্থাপিত কয়েকটি উদাহরণের ভিত্তিতে সব সরকারি কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে সমস্যা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রকৃত অসংগতি নিশ্চিত করতে সরকারি আদেশ, বেতন নির্ধারণী বিবরণী এবং প্রযোজ্য বিধান পরীক্ষা করা জরুরি।
কর্মচারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের মাধ্যমে বেতন সমতাকরণসংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। এতে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন আরও স্বচ্ছ হবে এবং বেতন নির্ধারণে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।


