সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় অসুস্থতা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ছুটির প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় কর্মচারীর ছুটির হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি জমা থাকে না। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে ছুটি পাওয়া সম্ভব, কত দিন ছুটি নেওয়া যায় এবং ছুটিকালীন বেতন ও চাকরিকালের ওপর কী প্রভাব পড়ে—এসব বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারি চাকরির প্রযোজ্য ছুটিবিধিতে নির্দিষ্ট শর্তে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি (Leave Not Due) মঞ্জুরের সুযোগ রয়েছে। প্রচলিতভাবে এ ছুটিকে অনেকে অগ্রিম ছুটি বা Advance Leave বলে থাকেন। তবে এ ধরনের ছুটি পাওয়ার জন্য কর্মচারীকে সংশ্লিষ্ট বিধির শর্ত পূরণ করতে হয়। শুধু আবেদন করলেই ছুটি মঞ্জুর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি কী এবং কেন দেওয়া হয়?
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি হলো এমন ছুটি, যা নির্দিষ্ট বিধান অনুসারে কর্মচারীর বর্তমান ছুটির প্রাপ্যতা অপর্যাপ্ত হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে মঞ্জুর করা যেতে পারে। সাধারণত ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালন করে ছুটি অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ ধরনের ছুটি দেওয়া হয়।
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে ছুটিতে যেতে চান। কিন্তু তাঁর অর্জিত ছুটির হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সময়ের ছুটি জমা নেই। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিধিমালার শর্ত পূরণ হলে তাঁর প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে সব কর্মচারীর জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। চাকরির স্থায়িত্ব, ছুটির ধরন, আবেদনের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা সনদে সর্বোচ্চ ১২ মাস ছুটির সুযোগ
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা চিকিৎসার কারণে অর্জিত ছুটি শেষ হয়ে গেলে এ বিধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে চিকিৎসা সনদ জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১২ মাস ছুটি পাওয়া যাবে—বিষয়টি এমন নয়।
ছুটির প্রয়োজনীয়তা, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর যোগ্যতা, প্রযোজ্য বিধান এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ছুটির আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়।
এখানে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, ১২ মাস হলো নির্দিষ্ট বিধানের অধীনে সমগ্র চাকরিজীবনের সর্বোচ্চ সীমা। এটি প্রত্যেকবার ১২ মাস করে ছুটি পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
চিকিৎসা সনদ ছাড়া তিন মাস পর্যন্ত ছুটি
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে চিকিৎসা সনদ ছাড়া ছুটি মঞ্জুরেরও বিধান রয়েছে। নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫-এর সাধারণ বিধান অনুসারে, যোগ্য স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত এ ধরনের ছুটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, চিকিৎসা সনদ না থাকলেও নির্দিষ্ট শর্তে ছুটির সুযোগ থাকতে পারে। তবে আবেদনকারীর প্রয়োজন, চাকরির অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিধির অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রেও তিন মাসের সীমাকে নিশ্চিতভাবে মঞ্জুরযোগ্য ছুটি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রযোজ্য বিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
অগ্রিম ছুটিতে কি পুরো বেতন পাওয়া যায়?
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের ছুটি সাধারণত অর্ধ-গড় বেতনে মঞ্জুর করা হয়।
তবে অর্ধ-গড় বেতনের ছুটি বলতে প্রত্যেক কর্মচারীর হাতে পাওয়া মোট মাসিক বেতনের অর্ধেক বোঝায়—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বেতনের হিসাব করতে হয়।
এ কারণে ছুটিতে যাওয়ার আগে কর্মচারীর উচিত নিজ দপ্তরের হিসাব শাখা থেকে সম্ভাব্য ছুটিকালীন বেতন সম্পর্কে জেনে নেওয়া। এতে ছুটির সময় আর্থিক পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে।
ছুটি শেষে দায়িত্বে যোগদান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, এ ধরনের ছুটি ভোগের পর কর্মে প্রত্যাবর্তন করলে ভোগ করা ছুটির সমপরিমাণ ছুটি পুনরায় অর্জন না করা পর্যন্ত নতুন করে ছুটি প্রাপ্য হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন কর্মচারী তিন মাস প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি ভোগ করলেন। ছুটি শেষে কাজে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে ভোগ করা ছুটির সমপরিমাণ ছুটি পুনরায় অর্জন করতে হবে।
তবে ঠিক কত দিন দায়িত্ব পালন করলে কত দিনের ছুটি অর্জিত হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ছুটি অর্জনের হার ও প্রযোজ্য বিধির ভিত্তিতে হিসাব করতে হবে।
ছুটি মঞ্জুরের আগে কর্তৃপক্ষ কী দেখবেন?
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
প্রথমত, আবেদনকারী এ ছুটি পাওয়ার যোগ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ছুটির কারণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মচারী ছুটি শেষে কাজে ফিরে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ভবিষ্যতে ছুটি অর্জন করতে পারবেন কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
এ কারণে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটিকে সাধারণ অর্জিত ছুটির মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোগ করার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদনযোগ্য একটি ছুটির ব্যবস্থা।
অগ্রিম ছুটি নিয়ে অবসর গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি ভোগরত অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট বিধানের প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ছুটি বাতিলের প্রয়োজনীয়তা, অবসরের কার্যকর তারিখ এবং অন্যান্য চাকরিসংক্রান্ত হিসাবের বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তাই অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও হিসাব শাখার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ছুটির কারণে অবসর-সুবিধা বা চাকরিকালের হিসাবে কোনো পরিবর্তন হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি কি পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে?
সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি ভোগ করলে তা পেনশনযোগ্য চাকরিকালের হিসাবে গণ্য হবে কি না।
এ বিষয়ে সব কর্মচারীর জন্য একই উত্তর দেওয়া যায় না। ছুটির প্রকৃতি, প্রযোজ্য চাকরিবিধি এবং পেনশনযোগ্য চাকরিকাল গণনার বিধানের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
তাই শুধু প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি নেওয়ার কারণে পেনশন সুবিধা নিশ্চিত হবে কিংবা কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। ব্যক্তির চাকরির অবস্থা ও ছুটির বিবরণ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বা পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যাখ্যা নেওয়া প্রয়োজন।
অগ্রিম ছুটি ও অর্জিত ছুটির মধ্যে পার্থক্য
অর্জিত ছুটি এবং প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি এক ধরনের নয়।
অর্জিত ছুটি হলো চাকরিবিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন ও নির্ধারিত নিয়মের ভিত্তিতে কর্মচারীর ছুটির হিসাবে জমা হওয়া ছুটি। অন্যদিকে, প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি নির্দিষ্ট শর্তে এমন পরিস্থিতিতে মঞ্জুর করা যেতে পারে, যখন কর্মচারীর বর্তমান ছুটির প্রাপ্যতা অপর্যাপ্ত।
অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রে ছুটির হিসাবে কত দিন জমা রয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, ছুটির সর্বোচ্চ সীমা, অনুমোদন এবং ভবিষ্যতে ছুটি অর্জনের শর্ত বিশেষ গুরুত্ব পায়।
আবেদন করার আগে যেসব বিষয় নিশ্চিত করবেন
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির আবেদন করার আগে সরকারি কর্মচারীদের কয়েকটি বিষয় যাচাই করা উচিত।
- চাকরি স্থায়ী হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বিধিতে এ ছুটির যোগ্যতা রয়েছে কি না।
- ছুটির হিসাবে বর্তমানে কত দিন অর্জিত ছুটি জমা রয়েছে।
- চিকিৎসাজনিত কারণে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত রয়েছে কি না।
- আগে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি নেওয়া হয়ে থাকলে সমগ্র চাকরিজীবনের সীমার কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে।
- ছুটিকালীন বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে।
- ছুটি শেষে কাজে যোগদান এবং ভবিষ্যতে ছুটি অর্জনের ক্ষেত্রে কী শর্ত প্রযোজ্য হবে।
- ছুটির কারণে চাকরিকাল, অবসর ও পেনশন-সংক্রান্ত হিসাবের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না।
এসব বিষয় আগে থেকে যাচাই করলে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব হবে।
প্রাসঙ্গিক বিধিমালা
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি সম্পর্কে ধারণা পেতে নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পার্ট-১-এর বিধি ১৮৪-সহ সংশ্লিষ্ট বিধান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে এসব বিধানের প্রয়োগক্ষেত্র এক নয়। ফলে একটি বিধিতে উল্লেখিত ছুটির মেয়াদ বা শর্ত অন্য বিধির আওতায় থাকা সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রযোজ্য আদেশ ও নির্দেশনাও বিবেচনায় নিতে হবে।
শেষ কথা
সরকারি চাকরিতে অর্জিত ছুটি অপর্যাপ্ত হলেও নির্দিষ্ট শর্তে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১২ মাস এবং চিকিৎসা সনদ ছাড়া সর্বোচ্চ তিন মাসের ছুটির বিধান নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে এ সুবিধা সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় নয়। চাকরির স্থায়িত্ব, ছুটির কারণ, প্রযোজ্য বিধিমালা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ছুটি মঞ্জুর নির্ভর করে।
তাই ছুটির আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শাখা ও হিসাব শাখার সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান নিশ্চিত করাই সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।




