সরকারি চাকরিজীবী নারীদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মাতৃত্বকালীন ছুটি সর্বোচ্চ দুইবার প্রযোজ্য। সরকারি সেবা-তথ্যেও বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস এবং এটি দুইবারের বেশি প্রযোজ্য নয়।
ফলে কোনো সরকারি কর্মচারী প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে দুইবার মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করে থাকলে, তৃতীয় সন্তানের জন্মের সময় একই বিধানে আবার ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দাবি করার সুযোগ থাকে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে সন্তান প্রসবের পর প্রয়োজন হলে কোনো ছুটিই নেওয়া যাবে না। ব্যক্তির ছুটি পাওনা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ছুটি মঞ্জুরি ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে অন্য ধরনের ছুটির আবেদন করা যেতে পারে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-তেও ছুটি প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশ অনুযায়ী ভোগের কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে কীভাবে ছুটি নেওয়া যেতে পারে?
এ ক্ষেত্রে প্রচলিতভাবে যে পদ্ধতির কথা সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, তা হলো চিকিৎসাজনিত ছুটি/অর্জিত ছুটি ব্যবহার করা। তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৬ মাসের ছুটি পাওয়ার অধিকার তৈরি করে না; সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ছুটি পাওনা এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকতে হবে।
যেমন—
প্রথম ধাপ:
চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সনদ নিতে হবে। সেখানে কর্মচারীর শারীরিক অবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময় বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ থাকতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ:
যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদন করতে হবে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নাগরিক সনদে চিকিৎসাজনিত অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রে ছুটি প্রাপ্যতার সনদ এবং চিকিৎসা সনদ/মেডিকেল বোর্ডের সনদের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তৃতীয় ধাপ:
কত দিনের ছুটি একসঙ্গে মঞ্জুর হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও দপ্তরের প্রচলিত নিয়মের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই কোনো উপজেলায় একবারে এক মাস, কোথাও আরও বেশি সময়ের ছুটি মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি থাকলেও সেটিকে সবার জন্য প্রযোজ্য সরকারি নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
১ মাস করে ছুটি নিয়ে ৬ মাস করা যাবে?
অনেক কর্মচারীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা ছুটি একবারে মঞ্জুর না করে পর্যায়ক্রমে ছুটি নেওয়া হয়। যেমন—এক মাস চিকিৎসা ছুটি, এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুনরায় আবেদন করে আরও এক মাস।
এভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত কারণ ও ছুটি পাওনা থাকলে পর্যায়ক্রমে ছুটি মঞ্জুর হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছুটি শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী ছুটির আবেদন ও অনুমোদন নিতে হবে এবং প্রতিটি মেয়াদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র দিতে হতে পারে।
অর্থাৎ, “এক মাস + এক মাস + এক মাস করে ছয় মাস নিলেই হবে”—এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম বলা যাবে না। ছুটি মঞ্জুর করবে যে কর্তৃপক্ষ, তার ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধান এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
উপজেলা শিক্ষা অফিস নাকি ডিপিও—কোথায় আবেদন?
প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ছুটির অনুমোদন পদ, কর্মস্থল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আর্থিক/প্রশাসনিক ক্ষমতা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই “উপজেলা শিক্ষা অফিস সর্বোচ্চ তিন মাসই দিতে পারে” বা “৬ মাস একসঙ্গে নিতে হলে অবশ্যই ডিপিওতে যেতে হবে”—এগুলোকে যাচাই ছাড়া সাধারণ সরকারি বিধান হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হলো—যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। সরকারি দপ্তরের নাগরিক সনদেও অর্জিত ছুটির জন্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন এবং ছুটি প্রাপ্যতার সনদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিনা বেতনে ছুটি কি নেওয়া যাবে?
তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটির দুইবারের সীমা শেষ হয়ে গেলে কেউ যদি চিকিৎসাজনিত বা অর্জিত ছুটির প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেন, তখন বিনা বেতনে ছুটি একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। তবে এটিও স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; সংশ্লিষ্ট বিধান ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।
তাই শুধু তৃতীয় সন্তান হয়েছে—এই কারণ দেখিয়ে সরাসরি ছয় মাস বিনা বেতনের ছুটি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: “মাতৃত্বকালীন ছুটি” ও “চিকিৎসা/অর্জিত ছুটি” এক নয়
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি:
সরকারি বিধান অনুযায়ী পূর্ণ বেতনে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত এবং বর্তমানে এটি দুইবারের বেশি প্রযোজ্য নয়।
চিকিৎসাজনিত/অর্জিত ছুটি:
এটি মাতৃত্বকালীন ছুটির বিকল্প হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৬ মাসের নতুন সুবিধা নয়। কর্মচারীর ছুটি পাওনা, চিকিৎসাগত প্রয়োজন, প্রয়োজনীয় সনদ এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটি মঞ্জুর হতে পারে।
বিনা বেতনের ছুটি:
প্রযোজ্য বিধান ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নেওয়া যেতে পারে; তবে এটিকে তৃতীয় সন্তানের জন্য নিশ্চিত ৬ মাসের ছুটি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
তাহলে করণীয় কী?
তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে আগে মাতৃত্বকালীন ছুটি দুইবার ভোগ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মেডিকেল সনদ সংগ্রহ করে নিজের ছুটি হিসাব/ছুটি পাওনা যাচাই করতে হবে। তারপর যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চিকিৎসাজনিত বা অর্জিত ছুটির আবেদন করতে হবে।
যদি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পুরো সময় একসঙ্গে মঞ্জুর করার ক্ষমতা না রাখে, তাহলে দপ্তরের প্রচলিত অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ছুটি বাড়ানোর আবেদন করা যেতে পারে। আর প্রয়োজনীয় ছুটি পাওনা না থাকলে বা চিকিৎসাজনিত ছুটির শর্ত পূরণ না হলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিনা বেতনের ছুটির বিধান বিবেচনা করতে হবে।
সুতরাং, “তৃতীয় সন্তানের জন্য ৬ মাস ছুটি নেওয়া যাবে না”—বিষয়টি একেবারে সরলভাবে বলা ঠিক নয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি দুইবারের সীমা শেষ হলেও, ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসাজনিত, অর্জিত বা অন্যান্য প্রযোজ্য ছুটির বিধান থাকতে পারে। তবে কোন ছুটি কতদিন এবং কোন কর্তৃপক্ষ মঞ্জুর করবেন—তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধি ও ছুটি পাওনার ওপর নির্ভরশীল।
নোট: উপজেলা শিক্ষা অফিস/ডিপিও পর্যায়ে একবারে কতদিন চিকিৎসা ছুটি মঞ্জুর করা যাবে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বর্তমান অফিস আদেশ পাওয়া গেলে সেটিই চূড়ান্তভাবে অনুসরণ করা উচিত। উপরোক্ত “১ মাস/৩ মাস করে ছুটি” বিষয়গুলো কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত, সর্বজনীন বিধান হিসেবে নয়।




