সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে নন-গেজেটেড হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এমন ধারণার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত এবং গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পদটির গ্রেড ও পদমর্যাদা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি নিরসনে মন্ত্রণালয়ের নথির ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-২ শাখার দেওয়া নথিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যমান বেতন গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনেও প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত
জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা এতদিন ১১তম গ্রেডে বেতন পেতেন। প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ১২তম গ্রেড প্রযোজ্য ছিল।
নতুন সিদ্ধান্তে প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। ১০ম গ্রেডের জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী মূল বেতন ১৬,০০০ থেকে ৩৮,৬৪০ টাকা। এর আগে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন ছিল ১২,৫০০ থেকে ৩০,২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডে ছিল ১১,৩০০ থেকে ২৭,৩০০ টাকা।
অর্থাৎ, ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার ফলে প্রধান শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর পাশাপাশি পদমর্যাদার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।
৬৫ হাজার ৫০২ জন প্রধান শিক্ষককে আওতায় আনা হয়েছে
সরকারি সিদ্ধান্তের আওতায় দেশের ৬৫ হাজার ৫০২ জন প্রধান শিক্ষককে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ ও বাস্তবায়ন অনুবিভাগের সম্মতির পর বিষয়টি প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির পর্যায়েও যায়।
এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার পাশাপাশি গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। নতুন গ্রেডে বেতন কার্যকর ধরা হয় ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে।
‘নন-গেজেটেড’ বিভ্রান্তি কেন?
প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে আলোচনায় অনেক সময় বেতন গ্রেড ও পদমর্যাদাকে একই বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
একটি পদ ১০ম গ্রেডে থাকা এবং সেটি গেজেটেড বা নন-গেজেটেড হওয়া—দুটি প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য। তবে এখানে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভাষাই মূল বিষয়। প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদের ১০ম গ্রেডের সঙ্গে গেজেটেড কর্মকর্তা পদমর্যাদার উল্লেখ রয়েছে।
তাই এই প্রজ্ঞাপনকে ভিত্তি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে নন-গেজেটেড পদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
আদালতের রায়ের ধারাবাহিকতায় সিদ্ধান্ত
প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও গেজেটেড কর্মকর্তা মর্যাদার বিষয়টি একদিনে আসেনি। এ নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ছিল।
২০১৯ সালে হাইকোর্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে সরকারের আপিলের পরও বিষয়টি আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের রায়ের ধারাবাহিকতায় প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা মর্যাদার বিষয়টি সামনে আসে।
পরবর্তীতে প্রথমে মামলার রিটকারী ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। এরপর বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে একই কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি
প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার ক্ষেত্রে একাধিক প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে।
প্রথমে অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে সম্মতি আসে। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা সম্মতি দেয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগও ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণে সম্মতি প্রদান করে।
এরপর প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের জন্য ১৮ মাসের শর্ত
১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে।
সরকারি আদেশ জারির তারিখ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে Basic Training for Primary Teachers (BTPT) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন ও মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যাতেও এই শর্তের উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডের আওতায় এলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নতুন গ্রেড বাস্তবায়নে বেতন ফিক্সেশন জটিলতা
১০ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রজ্ঞাপন জারি হলেও বাস্তবে বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন নিয়ে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রজ্ঞাপন জারির প্রায় ছয় মাস পরও অনেক প্রধান শিক্ষক ১০ম গ্রেড অনুযায়ী বেতন পাচ্ছিলেন না এবং ফিক্সেশন কার্যক্রম নিয়ে জটিলতা ছিল।
এ সমস্যা সমাধানে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগের কাছে প্রধান শিক্ষকদের উন্নীত গ্রেডে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে বিষয়টি iBAS++-এ অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও সামনে আসে।
বিশেষ করে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক, ১১তম গ্রেডে থাকা প্রধান শিক্ষক এবং আগে টাইমস্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া প্রধান শিক্ষকদের নতুন ১০ম গ্রেডে বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে—এসব বিষয়ে আলাদা নির্দেশনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
২০২৬ সালের নতুন পে স্কেলের সঙ্গে বিষয়টি কীভাবে যুক্ত হবে?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের ১০ম গ্রেডের বেতনস্কেল এবং ২০২৬ সালের নতুন বেতনস্কেলের অনুরূপ গ্রেডের মধ্যে বেতন নির্ধারণের প্রশ্নও এসেছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোয় ১০ম গ্রেডের প্রধান শিক্ষকদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রত্যেক প্রধান শিক্ষকের চূড়ান্ত নতুন মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি কোন স্কেলে, কোন ধাপে এবং কোনো উচ্চতর গ্রেড বা পূর্ববর্তী সুবিধায় ছিলেন—এসব বিষয় প্রযোজ্য সরকারি ফিক্সেশন বিধি অনুযায়ী বিবেচ্য হবে।
এক নজরে প্রধান শিক্ষকদের অবস্থান
| বিষয় | পূর্বের অবস্থা | উন্নীত অবস্থান |
|---|---|---|
| পদ | প্রধান শিক্ষক | প্রধান শিক্ষক |
| প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের গ্রেড | ১১তম | ১০ম গ্রেড |
| প্রশিক্ষণবিহীনদের গ্রেড | ১২তম | ১০ম গ্রেড |
| ১১তম গ্রেডের পুরোনো স্কেল | ১২,৫০০–৩০,২৩০ টাকা | — |
| ১০ম গ্রেডের পুরোনো স্কেল | — | ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা |
| পদমর্যাদা | দ্বিতীয় শ্রেণির পদ | গেজেটেড কর্মকর্তা |
| আওতাভুক্ত প্রধান শিক্ষক | — | ৬৫,৫০২ জন |
| প্রশিক্ষণবিহীনদের শর্ত | — | ১৮ মাসের মধ্যে BTPT |
| কার্যকর তারিখ | — | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ |
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
সরকারি নথি বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় পরিষ্কার হয়।
প্রথমত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে ১১তম/১২তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষককে গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তৃতীয়ত, ২০২৬ সালে মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নীত গ্রেডের বেতন ফিক্সেশন এবং iBAS++-এ সঠিকভাবে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি। বিশেষ করে পূর্বে টাইমস্কেল/উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এবং প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আলাদা হিসাবের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
শেষ কথা
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আদেশ, অর্থ বিভাগের সম্মতি এবং ২০২৫ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে ‘নন-গেজেটেড’ হিসেবে গণ্য করার ভিত্তি পাওয়া যায় না। বরং সরকারি প্রজ্ঞাপনে ১০ম গ্রেডের সঙ্গে গেজেটেড কর্মকর্তা পদমর্যাদা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের অধীনে প্রত্যেক প্রধান শিক্ষকের বর্তমান মূল বেতন, পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল এবং প্রশিক্ষণের অবস্থা বিবেচনা করে চূড়ান্ত পে ফিক্সেশন কীভাবে হবে, সেটিই এখন বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই iBAS++-এ বেতন নির্ধারণের জন্য মন্ত্রণালয়কে পৃথকভাবে স্পষ্টীকরণ দিতে হয়েছে।




