বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে সরকার। নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন কার্যক্রম আজ সোমবার, ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ অক্টোবরের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে এখন সরকারি চাকরিজীবীদের প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—নতুন পে স্কেলে নিজের মূল বেতন কত হবে, পে ফিক্সেশন কীভাবে করতে হবে, কোন তথ্য লাগবে, নতুন বেতন কবে থেকে পাওয়া যাবে এবং জুলাই থেকে বকেয়া কত টাকা পাওয়া যাবে।
নতুন বেতনকাঠামোর মূল আদেশ হিসেবে অর্থ বিভাগ ১৯ সেপ্টেম্বর ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে। এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারি মুদ্রণালয়ের গেজেটে এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬ হিসেবে আদেশটি প্রকাশিত হয়।
নতুন পে স্কেলের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কত?
নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—পে স্কেলের চার্টে কোনো গ্রেডের সর্বোচ্চ বা প্রারম্ভিক মূল বেতন দেখলেই প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত নতুন বেতন নির্ধারণ হয়ে যায় না।
ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেডসহ চাকরিজীবনের বিভিন্ন তথ্য বিবেচনায় আসবে। তাই একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর নতুন মূল বেতনও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে।
পে ফিক্সেশন শুরু ৫ অক্টোবর, শেষ করতে হবে ২০ অক্টোবর
অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত নতুন বেতন নির্ধারণের কাজ চলবে। পুরো প্রক্রিয়াটি iBAS++-এর নির্ধারিত Pay Fixation 2026 মডিউলের মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
এটি শুধু নতুন বেতনের একটি সাধারণ হিসাব নয়। বরং সরকারি চাকরিজীবীর পূর্ববর্তী বেতন-ইতিহাসের সঙ্গে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল সমন্বয় করে iBAS++-এ নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ, পে ফিক্সেশনের সময় পুরোনো তথ্য সঠিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পে ফিক্সেশনের আগে যেসব তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে
নতুন বেতন নির্ধারণের আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো যাচাই করে রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য;
- জন্মতারিখ;
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ;
- বর্তমান পদ ও গ্রেড;
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন;
- সর্বশেষ ইনক্রিমেন্টের তথ্য;
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য;
- পদোন্নতির তথ্য;
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য;
- টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের তথ্য;
- বদলি বা পদায়নসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য;
- সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও প্রজ্ঞাপন।
চাকরিজীবনের আগের বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি, বদলি, সময় স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য সঠিকভাবে দেওয়ার ওপর নতুন বেতন নির্ধারণের নির্ভুলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
iBAS++-এ কারা কীভাবে প্রবেশ করবেন?
পে ফিক্সেশনে প্রবেশের পদ্ধতি পদমর্যাদা অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
গেজেটেড কর্মকর্তারা তাঁদের নির্ধারিত iBAS++ ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন।
অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে প্রকাশিত নির্দেশনায় জানানো হয়েছে। পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP পাঠানো হতে পারে। বিদেশে অবস্থানরতদের ক্ষেত্রে ই-মেইলের মাধ্যমে OTP ব্যবহারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
যাঁদের NID-সংক্রান্ত তথ্য এখনো সঠিকভাবে সংযুক্ত নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে পে ফিক্সেশনের আগে সংশ্লিষ্ট NID তথ্য হালনাগাদ করা প্রয়োজন হতে পারে।
পে ফিক্সেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ৩০ জুনের বেতন
নতুন পে স্কেলে ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কার্যকর মূল বেতন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন বেতন কাঠামো, প্রাপ্য ইনক্রিমেন্ট এবং চাকরির অন্যান্য পরিবর্তন বিবেচনা করে iBAS++-এ নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
তাই কোনো কর্মচারী যদি মনে করেন তাঁর বর্তমান iBAS++ রেকর্ডে পুরোনো বেতন, ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতির তথ্য ভুল রয়েছে, তাহলে পে ফিক্সেশন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। নতুন বেতনকাঠামোর পে ফিক্সেশন নিয়ে প্রকাশিত নির্দেশনাগুলোতেও তথ্যের সঠিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার প্রস্তুতি
নতুন বেতন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন সমন্বয় নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর অক্টোবরের নিয়মিত বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের বকেয়া বা এরিয়ার অর্থ দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
তবে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সমান পরিমাণ বকেয়া পাবেন না।
বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে—
নতুন নির্ধারিত মূল বেতন – পূর্বের প্রাপ্য মূল বেতন = প্রযোজ্য বেতন পার্থক্য।
এরপর কার্যকর তারিখ, ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন, প্রাপ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী বকেয়ার হিসাব হবে।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘প্রত্যেক কর্মচারী নির্দিষ্ট অঙ্কের বকেয়া পাবেন’—এ ধরনের সাধারণ হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পে স্কেল চার্ট ২০২৬ কোথা থেকে পাবেন?
নতুন বেতন স্কেলের অফিশিয়াল পে স্কেল চার্ট পেতে হলে অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর সংযুক্ত বেতনসূচি দেখতে হবে।
অর্থ বিভাগের সরকারি বেতন আদেশ ২০২৬
এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর গেজেট আর্কাইভ থেকেও মূল গেজেটটি দেখা যায়। সেখানে ১৭ সেপ্টেম্বরের এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬ হিসেবে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ তালিকাভুক্ত রয়েছে।
মোবাইলে পে স্কেল ২০২৬ PDF দেখবেন যেভাবে
মোবাইল ব্যবহারকারীরা কয়েকটি ধাপে সরকারি পে স্কেলের PDF সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রথম ধাপ: অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ খুঁজে বের করতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট নোটিশের সংযুক্ত PDF ফাইল খুলতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: PDF-এ নিজের গ্রেডের বেতনসূচি খুঁজে দেখতে হবে।
পঞ্চম ধাপ: গ্রেডের বেতনসূচির সঙ্গে নিজের iBAS++ Pay Fixation-এ নির্ধারিত মূল বেতন মিলিয়ে দেখতে হবে।
শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও বা অনানুষ্ঠানিক চার্ট দেখে বেতন চূড়ান্ত না করে সরকারি গেজেটের সঙ্গে তথ্য যাচাই করাই নিরাপদ।
শ্রম মন্ত্রণালয়ও iBAS++ পে ফিক্সেশন নিয়ে নোটিশ দিয়েছে
পে ফিক্সেশন কার্যক্রম যে এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪ অক্টোবরের নোটিশ।
মন্ত্রণালয় iBAS++ Pay Fixation Sub-System-এ জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর বেতন নির্ধারণী কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জনবলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রেরণ সংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশ করেছে। Ministry of Liberation War Affairs
অর্থাৎ এখন শুধু গেজেট প্রকাশের পর্যায় নয়; বরং সরকারি দপ্তরগুলোতে কর্মচারীদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং iBAS++-এর পে ফিক্সেশন ব্যবস্থায় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পর্যায় শুরু হয়েছে।
ভুল তথ্য থাকলে কী করবেন?
পে ফিক্সেশনের সময় যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী দেখতে পান যে তাঁর—
- মূল বেতন ভুল,
- ইনক্রিমেন্টের তারিখ ভুল,
- পদোন্নতির তথ্য নেই,
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য নেই,
- জন্মতারিখ ভুল,
- NID তথ্যের সঙ্গে রেকর্ডের মিল নেই,
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনে সমস্যা রয়েছে,
তাহলে সরাসরি ভুল তথ্য দিয়ে ফিক্সেশন সম্পন্ন না করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা উচিত।
কারণ নতুন পে স্কেলে একবার ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ হলে পরবর্তী সময়ে সংশোধন, সমন্বয় বা বকেয়া পুনর্গণনার প্রয়োজন হতে পারে।
সবশেষে
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এখন আর শুধু প্রজ্ঞাপন বা আলোচনার পর্যায়ে নেই। ৫ অক্টোবর থেকে iBAS++-এ পে ফিক্সেশন শুরু হওয়ায় এটি বাস্তব বেতন নির্ধারণের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করার লক্ষ্য থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা এবং নির্ধারিত নিয়মে নতুন বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করা।
একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ায় জুলাই-সেপ্টেম্বরের বকেয়া এবং অক্টোবরের নতুন বেতনের হিসাব নিয়েও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে নতুন মূল বেতন ও বকেয়ার পরিমাণ আলাদা হওয়ায় চূড়ান্ত হিসাব জানতে iBAS++-এ সম্পন্ন হওয়া Pay Fixation ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং পে স্কেল ২০২৬-এর চার্ট দেখার পাশাপাশি নিজের ৩০ জুনের মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য সঠিক আছে কি না—এখনই যাচাই করা জরুরি।




