নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারদের পেনশন পুনর্নির্ধারণ নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে—পেনশনারদের কি কর্মরত চাকরিজীবীদের মতো আলাদাভাবে পে-ফিক্সেশন করতে হবে, নাকি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন পেনশন নির্ধারণ হবে?
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়লেও এখন বিষয়টি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো অর্থ বিভাগের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধাদি/প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের নতুন নিয়ম দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটেও প্রজ্ঞাপনটি ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত/তালিকাভুক্ত রয়েছে।
পেনশনারদের জন্য আলাদা ‘পে-ফিক্সেশন’ কি প্রয়োজন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। কর্মরত চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা Pay Fixation এবং অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন পুনর্নির্ধারণ একই প্রক্রিয়া নয়।
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর অধীনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পেনশনারের ক্ষেত্রে নতুন করে ‘মূল বেতন’ নির্ধারণ নয়; বরং নতুন বিধান অনুযায়ী প্রাপ্য পেনশন পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনেও সরাসরি সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধাদি/প্রাপ্যতা ‘নির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণ’ করার কথা বলা হয়েছে।
অতএব, পেনশনারদের জন্য কর্মরত চাকরিজীবীদের মতো ব্যক্তিগতভাবে নতুন বেতন ফিক্সেশন করার বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য—এমন তথ্য প্রজ্ঞাপনে নেই।
তাহলে ‘অটো ফিক্সেশন’ কথাটি কতটা সত্য?
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে ‘অটো ফিক্সেশন’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের ভিত্তিতে শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না যে প্রত্যেক পেনশনারের পেনশন কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবে নতুন হারে চলে যাবে।
তবে প্রজ্ঞাপনের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার নতুন পেনশন নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট হার ও সূত্র নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ পেনশনারদের জন্য নতুন পেনশন কত হবে, সেটি নির্ধারণের নীতিমালা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করা হয়েছে।
এখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা কীভাবে বিদ্যমান পেনশন তথ্য নিয়ে পুনর্নির্ধারণ করবে—সেটিই মূল বিষয়।
কম পেনশন পাওয়া পেনশনাররা বেশি হারে সুবিধা পাবেন
নতুন ব্যবস্থায় পেনশনারদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো নিট পেনশন বৃদ্ধির পৃথক হার।
২ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে নিট পেনশন কার্যকর ছিল, তার ওপর নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হারগুলো হলো—
| ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন | বৃদ্ধির হার |
|---|---|
| সর্বনিম্ন ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত | ১০০% |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% |
| ৪০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব | ৫৫% |
প্রজ্ঞাপনে এসব হারের ভিত্তিতে নতুন নিট পেনশনের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমাও দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন কাঠামোয় কম পেনশন পাওয়া পেনশনারদের জন্য বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
উদাহরণ দিয়ে বুঝলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার
ধরা যাক, কোনো পেনশনারের ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে নিট পেনশন ছিল ৯,০০০ টাকা।
প্রজ্ঞাপনের ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হার অনুযায়ী তার নতুন নিট পেনশন হবে ১৮,০০০ টাকা।
আবার কারও নিট পেনশন যদি ১৫,০০০ টাকা হয়, তাহলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির ভিত্তিতে নতুন নিট পেনশন হবে ২৬,২৫০ টাকা।
একইভাবে ২৫,০০০ টাকা নিট পেনশন হলে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে তা হবে ৪১,২৫০ টাকা।
তবে বাস্তবে প্রত্যেক পেনশনারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম, পূর্বের পেনশন রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণ করতে হবে।
৩০ জুন ২০২৬-এর পেনশনকে ভিত্তি ধরা হয়েছে
প্রজ্ঞাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কার্যকর নিট পেনশনকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে নতুন নিট পেনশন নির্ধারণের কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে পেনশনারদের নতুন পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে পুরোনো রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ শুধু বর্তমান ব্যাংক হিসাবে কত টাকা আসছে সেটি দেখে নতুন পেনশন নির্ধারণ করা হবে—এমন নয়; নির্ধারিত ভিত্তি ও প্রজ্ঞাপনের হার অনুসরণ করতে হবে।
পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রেও নতুন হার নির্ধারিত
প্রজ্ঞাপনের প্রথম অংশে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল অনুযায়ী গ্রস পেনশন নির্ধারণের হারও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে ৫ বছর চাকরিকালের জন্য ২১ শতাংশ থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরিকালের জন্য ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে চাকরিকালও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
তবে ৫ থেকে ২৪ বছরের পেনশনযোগ্য চাকরিকালের পেনশন নিয়ে প্রজ্ঞাপনে বিশেষ শর্তও দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু শতাংশ প্রয়োগ করলেই চূড়ান্ত পেনশন বের হয়ে যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পেনশনারদের কি হিসাবরক্ষণ অফিসে যেতে হবে?
এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন।
সরকারি পেনশন ব্যবস্থার কাঠামো অনুযায়ী হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ বিভাগের পেনশনসংক্রান্ত নির্দেশনায় পেনশন কেইস প্রক্রিয়াকরণ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়গুলো আলাদাভাবে নির্ধারিত রয়েছে।
এ ছাড়া অর্থ বিভাগের সরকারি সেবা তালিকায় পেনশনারদের EFT পদ্ধতিতে মাসিক পেনশন প্রেরণ চালু থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং এটি iBAS++-এর সঙ্গে যুক্ত।
তাই নতুন পেনশন পুনর্নির্ধারণের বাস্তবায়নেও হিসাবরক্ষণ ও ডিজিটাল সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার ভূমিকা থাকবে—এটি স্পষ্ট।
তবে প্রত্যেক পেনশনারকে ব্যক্তিগতভাবে হিসাবরক্ষণ অফিসে গিয়ে নতুন করে পে-ফিক্সেশন করতেই হবে, এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
‘হাদিয়া’ দেওয়ার প্রশ্নে কী করবেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় কেউ কেউ পেনশন পুনর্নির্ধারণের জন্য ‘হাদিয়া’ বা অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছেন। এ বিষয়ে পেনশনারদের সতর্ক থাকা উচিত।
সরকারি পেনশন পুনর্নির্ধারণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে হাদিয়া, ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার কোনো বৈধ নিয়ম নেই।
পেনশন হিসাব সংশোধন বা পুনর্নির্ধারণে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধান করতে হবে। কোনো ব্যক্তি অর্থ দাবি করলে সেটিকে সরকারি নিয়মের অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
নতুন পেনশন কবে থেকে কার্যকর?
অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী পেনশনারদের নিট পেনশনসহ সংশ্লিষ্ট পুনর্নির্ধারিত সুবিধা ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে।
অর্থাৎ বাস্তবায়ন বা পরিশোধের সময় পরবর্তী পর্যায়ে হলেও প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬।
এ কারণে পেনশনারদের মধ্যে জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন হারে পেনশন এবং প্রাপ্য বকেয়া নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আনুতোষিক
শুধু মাসিক পেনশন নয়, প্রজ্ঞাপনে আনুতোষিকের হারও নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পেনশনযোগ্য চাকরিকালের বিভিন্ন পর্যায়ে আনুতোষিকের হার নির্ধারণ করা হয়েছে—৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১০ বছরের কম চাকরিকালে প্রতি টাকায় ২৬৫ টাকা, ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১৫ বছরের কমে ২৬০ টাকা, ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ২০ বছরের কমে ২৪৫ টাকা এবং ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরিকালে ২৩৫ টাকা।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধা নির্ধারণে একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় থাকবে।
তাহলে চূড়ান্ত কথা কী?
সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়—
পেনশনারদের ক্ষেত্রে কর্মরত চাকরিজীবীদের মতো আলাদাভাবে অনলাইনে ‘পে-ফিক্সেশন’ করার বিষয়টি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং পেনশনারদের বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে নতুন নিয়মে পেনশন নির্ধারণ/পুনর্নির্ধারণের কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
তবে এটিকে সরাসরি ‘অটো ফিক্সেশন’ বলা হবে কি না, সেটি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কারিগরি নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে। অর্থ বিভাগের প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ‘অটো ফিক্সেশন’ শব্দটি নেই। তাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাখ্যা হলো—পেনশনারদের নতুন পেনশন পুনর্নির্ধারণ সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা; প্রত্যেক পেনশনারকে কর্মরত চাকরিজীবীদের মতো নিজে নতুন করে পে-ফিক্সেশন করতে হবে—এমন নির্দেশনা এই প্রজ্ঞাপনে নেই।
অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর জন্য আলাদা সরকারি পেজ চালু করেছে এবং ৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সেটি হালনাগাদ রয়েছে। অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়
সুতরাং পেনশনারদের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা, নিজের PPO/পেনশন সংক্রান্ত তথ্য ঠিক আছে কি না নিশ্চিত রাখা এবং কেউ অবৈধ অর্থ দাবি করলে তা প্রদান না করা। বাস্তবায়নের সময় হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনাই হবে চূড়ান্ত।




