সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার হিসাব প্রস্তুত ও বিল তৈরির কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ ডিজিটাল টুল। ‘বকেয়া বেতন বিল জেনারেটর’ নামের এই টুলের মাধ্যমে কর্মচারীদের বেতনসংক্রান্ত তথ্য ইনপুট দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বকেয়ার হিসাব নির্ধারণ, পৃথক বেতন বিল তৈরি এবং প্রিন্ট বা PDF আকারে সংরক্ষণ করা যাবে।
বিশেষ করে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন এবং আগের স্কেলে উত্তোলিত বেতন-ভাতার পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে টুলটি সহায়ক হতে পারে। এতে একাধিক কর্মচারীর তথ্য একসঙ্গে যুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। ফলে প্রতিটি কর্মচারীর জন্য আলাদাভাবে হিসাব তৈরি করার পরিবর্তে একই প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে একাধিক বিল প্রস্তুত করা সম্ভব।
বকেয়া বেতন হিসাবের জন্য থাকছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা
বকেয়া বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন-ভাতা এবং আগের স্কেলে উত্তোলিত বেতন-ভাতার পার্থক্য হিসাব করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে সহজ করার জন্য জেনারেটরটিতে পৃথক কয়েকটি ইনপুট ফিল্ড রাখা হয়েছে।
এতে পুরোনো মূল বেতন, আগের বাড়ি ভাড়া, ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে উত্তোলিত মূল বেতন, উত্তোলিত বাড়ি ভাড়া, বিশেষ সুবিধা এবং নতুন স্কেলে প্রাপ্য ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট প্রাপ্য অর্থ, উত্তোলিত অর্থ এবং চূড়ান্ত বকেয়ার পরিমাণ হিসাব করবে।
কোন কোন তথ্য দিতে হবে?
বকেয়া বেতন বিল তৈরি করতে প্রথমে ডেটা এন্ট্রি বিভাগে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে কর্মচারীভিত্তিক প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।
প্রধান তথ্যগুলো হলো—
1. কর্মচারীর নাম ও পদবি।
2. বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নাম।
3. জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর।
4. জিপিএফ হিসাব নম্বর।
5. কর্মচারীর বেতন গ্রেড।
6. পুরোনো মূল বেতন।
7. পুরোনো বাড়ি ভাড়া।
8. ২০১৫ সালের স্কেলে উত্তোলিত মূল বেতন।
9. উত্তোলিত বাড়ি ভাড়া।
10. বিশেষ সুবিধার পরিমাণ।
11. নতুন স্কেলে প্রাপ্য ৫০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ।
প্রতিটি কর্মচারীর তথ্য আলাদাভাবে যুক্ত করা যাবে। প্রয়োজনে নতুন সারি যুক্ত করে আরও কর্মচারীর তথ্য ইনপুট দেওয়া এবং ভুল তথ্য সংশোধন বা মুছে ফেলার সুবিধাও রয়েছে।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বকেয়া হিসাবের নমুনা
জেনারেটরটির প্রাথমিক সেটিংসে জুলাই ২০২৬, আগস্ট ২০২৬ এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের বকেয়া হিসাবের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
ব্যবহারকারী চাইলে বকেয়ার মাস পরিবর্তন করতে পারবেন। একাধিক মাসের নাম কমা দিয়ে আলাদা করে লিখলে সফটওয়্যারটি মাসের সংখ্যা অনুযায়ী হিসাব করবে।
এ ছাড়া বাড়ি ভাড়ার হার, বিশেষ সুবিধার হার এবং স্ট্যাম্প ডিউটির পরিমাণ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
ডিফল্ট সেটিংসে দেওয়া হয়েছে—
| হিসাবের বিষয় | নির্ধারিত হার/পরিমাণ |
|---|---|
| বাড়ি ভাড়া | ৪০% |
| বিশেষ সুবিধা | ১৫% |
| স্ট্যাম্প ডিউটি | ১০ টাকা |
| বেতন বৃদ্ধির হিসাব | ৫০% |
তবে এগুলো জেনারেটরের প্রাথমিক সেটিংস। প্রকৃত বকেয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ অনুযায়ী হার ও অর্থের পরিমাণ যাচাই করতে হবে।
কীভাবে বকেয়ার চূড়ান্ত পরিমাণ বের হবে?
জেনারেটরটিতে বকেয়া হিসাবের জন্য একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
হিসাবের সূত্র:
বকেয়া = (নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন ও ভাতা × বকেয়া মাসের সংখ্যা) − (আগের স্কেলে উত্তোলিত বেতন ও ভাতা × বকেয়া মাসের সংখ্যা) − স্ট্যাম্প ডিউটি।
এখানে নতুন স্কেলে প্রাপ্য অংশে মূল বেতন ও বাড়ি ভাড়া যুক্ত হবে। অন্যদিকে আগের স্কেলে উত্তোলিত অংশে মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া এবং বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
হিসাব শেষে বকেয়ার পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে। শুধু সংখ্যায় নয়, টাকার পরিমাণ বাংলায় কথায় লেখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এক ক্লিকেই তৈরি হবে পৃথক Salary Bill
টুলটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বিল তৈরি। কর্মচারীদের তথ্য ইনপুট দেওয়ার পর ‘বিল (Salary_Bill)’ বিভাগে প্রবেশ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নামে বিল দেখা যাবে।
বিলে কর্মচারীর নাম, পদবি, NID, GPF, দপ্তরের নাম, প্রাতিষ্ঠানিক কোড, বছর, মাস, টোকেন নম্বর, ভাউচার নম্বর এবং তারিখ প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া বিলে থাকবে—
-
অর্থনৈতিক কোড;
-
মাসভিত্তিক মূল বেতনের হিসাব;
-
বাড়ি ভাড়ার হিসাব;
-
বিশেষ সুবিধার হিসাব;
-
প্রাপ্য অর্থের উপমোট;
-
আগের উত্তোলিত অর্থের উপমোট;
-
স্ট্যাম্প ডিউটি;
-
চূড়ান্ত বকেয়ার পরিমাণ;
-
টাকার পরিমাণ কথায় প্রকাশ;
-
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষণ অফিসের স্বাক্ষরের জায়গা।
বিলের কাঠামোতে টিআর ফরম ১৫ এবং এসআর ১৫০(১)-এর উল্লেখও রাখা হয়েছে।
একসঙ্গে সব কর্মচারীর বিল PDF করা যাবে
একাধিক কর্মচারীর বকেয়া বিল প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা প্রিন্ট করার প্রয়োজন কমাতে দুটি বিশেষ অপশন রাখা হয়েছে।
সকলের Print/PDF: এই অপশনে তালিকাভুক্ত সব কর্মচারীর বিল একসঙ্গে প্রিন্ট বা PDF করা যাবে। প্রতিটি কর্মচারীর জন্য আলাদা বিল তৈরি হবে।
শুধু বর্তমান Print: নির্দিষ্ট একজন কর্মচারীর বিল নির্বাচন করে শুধু সেই বিলটি প্রিন্ট করা যাবে।
PDF সংরক্ষণের জন্য প্রিন্ট ডায়ালগ থেকে ‘Save as PDF’ নির্বাচন করতে হবে। বিলের প্রিন্ট লেআউট A4 কাগজের জন্য নির্ধারিত।
ব্রাউজারেই সংরক্ষিত থাকবে ইনপুট করা তথ্য
জেনারেটরটিতে Local Storage প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে একই ব্রাউজারে তথ্য ইনপুট করার পর তা সংরক্ষিত থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে একই ব্রাউজার থেকে ফাইলটি খুললে আগের তথ্য পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
এ ছাড়া Previous ও Next অপশনের মাধ্যমে এক কর্মচারী থেকে অন্য কর্মচারীর বিল দেখা যাবে। কর্মচারীর নাম নির্বাচন করেও সরাসরি নির্দিষ্ট বিল প্রদর্শন করা সম্ভব।
তবে ব্রাউজারের ডেটা মুছে ফেললে বা অন্য ডিভাইস কিংবা ব্রাউজার ব্যবহার করলে আগের তথ্য পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় বিল PDF করে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।
ব্যবহারের আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই যাচাই করবেন
জেনারেটরটি বকেয়া হিসাব তৈরির কাজ সহজ করলেও এটি নিজে কোনো সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা নয়। তাই প্রস্তুতকৃত বিল সরাসরি দাখিল করার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
১. বেতন বৃদ্ধির হার: নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন এবং ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
২. বাড়ি ভাড়া ও বিশেষ সুবিধা: সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই হার প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী তথ্য দিতে হবে।
৩. অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ: জেনারেটরে শ্রান্তি বিনোদন ভাতার অতিরিক্ত উত্তোলিত অংশ সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও স্বয়ংক্রিয় হিসাবে এটি শূন্য রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আলাদাভাবে সমন্বয় করতে হবে।
৪. স্ট্যাম্প ডিউটি: ডিফল্ট ১০ টাকা দেওয়া থাকলেও প্রকৃত প্রযোজ্য কর্তনের পরিমাণ যাচাই করতে হবে।
৫. ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা: NID ও GPF নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তথ্যগুলো ব্রাউজারের Local Storage-এ সংরক্ষিত হয়।
শেষ কথা
সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার হিসাব তৈরি, কর্মচারীভিত্তিক বিল প্রস্তুত এবং প্রিন্ট করার কাজ সহজ করতে ‘বকেয়া বেতন বিল জেনারেটর’ একটি কার্যকর সহায়ক উদ্যোগ হতে পারে। বিশেষ করে একাধিক কর্মচারীর তথ্য একই জায়গায় ইনপুট দিয়ে পৃথক বিল তৈরির সুবিধা থাকায় সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে জেনারেটরের হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যাবে না। সরকারি বেতন-ভাতা সংক্রান্ত আদেশ, প্রযোজ্য অর্থনৈতিক কোড, কর্তন এবং হিসাবরক্ষণ বিধি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিল যাচাই করতে হবে।




