নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি অবসরভোগীদের পেনশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ৯ হাজার ও ৯ হাজার ১ টাকা নিয়ে। বিশেষ করে যাদের নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা, তারা কি ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবেন, নাকি ৭৫ শতাংশের স্ল্যাবে পড়বেন—এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে পেনশন পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত বা প্রাপ্য নিট পেনশনকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে কেউ কত টাকা পাচ্ছেন, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়; ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর নিট পেনশন কত ছিল, সেটিই স্ল্যাব নির্ধারণের মূল ভিত্তি।
৯ হাজার টাকা কি বেসিক পেনশন?
এখানে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। নতুন পেনশন বৃদ্ধির সারণিতে যে ৯,০০০ টাকা বলা হয়েছে, সেটি সাধারণভাবে ‘বেসিক পেনশন’ বোঝাচ্ছে না। সারণির ভিত্তি হচ্ছে ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন।
অর্থাৎ কোনো পেনশনভোগীর মূল পেনশন কত ছিল, সেটি আলাদাভাবে হিসাবের অংশ হলেও নতুন বৃদ্ধির স্ল্যাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক হলো ৩০ জুনের নিট পেনশন।
নতুন পেনশনের স্ল্যাব এক নজরে
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে এভাবে—
| ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন | নির্ধারিত বৃদ্ধির হার | নতুন ন্যূনতম নিট পেনশন | নতুন সর্বোচ্চ নিট পেনশন |
|---|---|---|---|
| সর্বনিম্ন–৯,০০০ টাকা | ১০০% | ১০,০০০ টাকা | ১৮,০০০ টাকা |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% | ১৮,০০১ টাকা | ৩৫,০০০ টাকা |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% | ৩৫,০০১ টাকা | ৪৯,০০০ টাকা |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% | ৪৯,০০১ টাকা | ৬২,০০০ টাকা |
| ৪০,০০১ টাকা বা বেশি | ৫৫% | ৬২,০০১ টাকা | ৭০,২০০ টাকা |
অর্থাৎ ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। কিন্তু ৯,০০১ টাকা থেকে পরবর্তী স্ল্যাব শুরু হওয়ায় ৯,০০১ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তি ৭৫ শতাংশের স্ল্যাবে পড়বেন।
মাত্র ১ টাকার ব্যবধানে কেন স্ল্যাব পরিবর্তন?
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়।
যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কারও নিট পেনশন ৯,০০০ টাকা হয়, তিনি প্রথম স্ল্যাবে থাকবেন এবং নির্ধারিত বৃদ্ধির হার হবে ১০০ শতাংশ।
কিন্তু একই তারিখে কারও নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা হলে তিনি দ্বিতীয় স্ল্যাবে চলে যাবেন এবং নির্ধারিত বৃদ্ধির হার হবে ৭৫ শতাংশ।
অর্থাৎ ৯,০০০ টাকা ও ৯,০০১ টাকা একই স্ল্যাবে নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৯,০০১ টাকা পাওয়া ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত ৯,০০১ টাকার ওপর শুধু ৭৫ শতাংশ যোগ করে যে অঙ্ক হবে, সেটিই চূড়ান্ত পেনশন। কারণ দ্বিতীয় স্ল্যাবে ন্যূনতম নতুন নিট পেনশন ১৮,০০১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯,০০১ টাকা নিট পেনশন হলে হিসাব কী দাঁড়ায়?
ধরা যাক, একজন পেনশনভোগীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের নিট পেনশনও ৯,০০১ টাকা ছিল।
তিনি ৯,০০১–২০,০০০ টাকার স্ল্যাবে পড়বেন।
এই স্ল্যাবে নতুন ন্যূনতম নিট পেনশন:
১৮,০০১ টাকা।
অতএব পূর্ণ নতুন পেনশনের সঙ্গে বর্তমান পেনশনের পার্থক্য হবে—
১৮,০০১ − ৯,০০১ = ৯,০০০ টাকা।
অর্থাৎ পূর্ণ বাস্তবায়নের পর্যায়ে এই উদাহরণে নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা থেকে ১৮,০০১ টাকা হতে পারে।
এখানে কার্যকর অঙ্কের বৃদ্ধি প্রায় ১০০ শতাংশের সমান হলেও, ৯,০০১ টাকা মূল স্ল্যাবটি ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির স্ল্যাব—এই দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
অক্টোবর ২০২৬-এ কি সরাসরি ১৮,০০১ টাকা পাওয়া যাবে?
না।
নতুন পেনশন সুবিধা একসঙ্গে শতভাগ কার্যকর হচ্ছে না। প্রজ্ঞাপনে পেনশন বৃদ্ধিও পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন নির্ধারিত নিট পেনশন ও পুরোনো নিট পেনশনের পার্থক্যের ৫০ শতাংশ বিদ্যমান নিট পেনশনের সঙ্গে যোগ করার বিধান রয়েছে।
এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এই পার্থক্যের ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে।
আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ বৃদ্ধি, প্রযোজ্য বার্ষিক বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ কার্যকর হবে।
৯,০০১ টাকার উদাহরণে ধাপে ধাপে হিসাব
যদি ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা হয় এবং নতুন নির্ধারিত নিট পেনশন ১৮,০০১ টাকা ধরা হয়, তাহলে—
পুরোনো নিট পেনশন: ৯,০০১ টাকা
পূর্ণ নতুন নিট পেনশন: ১৮,০০১ টাকা
মোট সম্ভাব্য বৃদ্ধি: ৯,০০০ টাকা
প্রথম ধাপ: জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬
বর্ধিত অঙ্কের ৫০ শতাংশ:
৯,০০০ × ৫০% = ৪,৫০০ টাকা
তাহলে:
৯,০০১ + ৪,৫০০ = ১৩,৫০১ টাকা।
অর্থাৎ অন্য কোনো সমন্বয় বা কর্তন না থাকলে, এই উদাহরণে প্রথম পর্যায়ের নিট পেনশন ১৩,৫০১ টাকা দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় ধাপ: জানুয়ারি–জুন ২০২৭
বর্ধিত অঙ্কের ৭৫ শতাংশ:
৯,০০০ × ৭৫% = ৬,৭৫০ টাকা
তাহলে:
৯,০০১ + ৬,৭৫০ = ১৫,৭৫১ টাকা।
তৃতীয় ধাপ: ১ জুলাই ২০২৭ থেকে
পূর্ণ ৯,০০০ টাকা বৃদ্ধি কার্যকর হলে:
৯,০০১ + ৯,০০০ = ১৮,০০১ টাকা।
অর্থাৎ উদাহরণটির ধারাবাহিকতা হবে—
৯,০০১ → ১৩,৫০১ → ১৫,৭৫১ → ১৮,০০১ টাকা।
এই হিসাবটি ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা ধরে করা হয়েছে।
তাহলে যাদের ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে ৯,০০১ টাকা হয়েছে?
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে।
কেউ যদি বলেন, “আমি ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে ৯,০০১ টাকা পেনশন পাচ্ছি”, শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর নতুন পেনশন নিশ্চিতভাবে ১৩,৫০১ টাকা হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।
কারণ প্রজ্ঞাপনের ভিত্তি হলো ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর প্রাপ্ত বা প্রাপ্য নিট পেনশন।
অতএব ১ আগস্টে ৯,০০১ টাকা পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে—
৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর নিট পেনশন কত ছিল?
যদি সেটিও ৯,০০১ টাকা হয়ে থাকে, তাহলে ওপরের হিসাব প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু ৩০ জুনের নিট পেনশন যদি অন্য অঙ্কের হয়ে থাকে এবং ১ আগস্টের ৯,০০১ টাকা পরবর্তী কোনো পুনর্নির্ধারণ, নতুন অবসর বা অন্য কোনো কারণে হয়ে থাকে, তাহলে হিসাব আলাদা হতে পারে।
‘৭৫% বৃদ্ধি’ আর ‘১৮,০০১ টাকা’—দুটো কি একই কথা?
না। এখানেই মূল বিভ্রান্তি।
৭৫ শতাংশ হলো ৯,০০১ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশনের জন্য নির্ধারিত বৃদ্ধির হার।
অন্যদিকে ১৮,০০১ টাকা হলো ওই স্ল্যাবের নতুন ন্যূনতম নিট পেনশন।
তাই ৯,০০১ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু—
৯,০০১ × ৭৫%
হিসাব করে ৬,৭৫০.৭৫ টাকা বের করে সেটিকে চূড়ান্ত নতুন পেনশন হিসেবে দেখানো যাবে না।
কারণ নতুন কাঠামোয় ওই স্ল্যাবের ন্যূনতম নিট পেনশন ১৮,০০১ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নতুন প্রজ্ঞাপনে শুধু নিট পেনশন বৃদ্ধিই নয়, পেনশন ও অবসর-সুবিধার বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির সময় পর্যন্ত প্রাপ্য নিট পেনশনের বকেয়া দেওয়ার বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০,২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৯,০০০ টাকা বা তার কম নিট পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা যথাক্রমে ১০,০০০ ও ১৮,০০০ টাকা।
শেষ কথা
নবম পে স্কেলের পেনশন হিসাব বুঝতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হলো—
প্রথমত, ৯,০০০ টাকা বলতে বেসিক নয়, সংশ্লিষ্ট স্ল্যাবের ভিত্তি হিসেবে ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন বিবেচনা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের স্ল্যাবে বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ, কিন্তু ৯,০০১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত স্ল্যাবে বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ।
তৃতীয়ত, নতুন পেনশন একবারে পুরোপুরি দেওয়া হচ্ছে না। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ ১০০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার কাঠামো রাখা হয়েছে।
সুতরাং, ৩০ জুন ২০২৬-এ নিট পেনশন ৯,০০১ টাকা ছিল—এমন একজন পেনশনভোগীর উদাহরণে পূর্ণ নতুন নিট পেনশন ১৮,০০১ টাকা হলে পর্যায়ক্রমে ১৩,৫০১ টাকা, ১৫,৭৫১ টাকা এবং শেষ ধাপে ১৮,০০১ টাকা হওয়ার হিসাব দাঁড়ায়। তবে ব্যক্তিগত পেনশন স্লিপে ৩০ জুনের নিট পেনশন, কর্তন ও পরবর্তী সমন্বয় যাচাই করেই চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণ করতে হবে।




