নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম নিয়ে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে iBAS++-এ পে-ফিক্সেশন করতে গিয়ে কীভাবে তথ্য দিতে হবে, কোথায় কী পরিবর্তন করা যাবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল কি না—এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ধাপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, iBAS++-এর পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং অধিকাংশ কাজ কর্মচারীরা নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবেন।
পে-ফিক্সেশনের জন্য কর্মচারীদের শুরু থেকে সব তথ্য নতুন করে প্রবেশ করাতে হবে না। বিদ্যমান EFT-সংক্রান্ত তথ্যের বড় একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে iBAS++-এ চলে আসবে। ফলে কর্মচারীর মূল দায়িত্ব হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনীয় জায়গায় তথ্য দেওয়া এবং প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা।
সাতটি ধাপে সম্পন্ন হবে পে-ফিক্সেশন
প্রাথমিকভাবে iBAS++-এর পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় মোট সাতটি ট্যাব বা ধাপের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিটি ট্যাব একবার করে খুলে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে Save & Continue করতে হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিটি ধাপে নতুন করে বিপুল পরিমাণ তথ্য টাইপ করার প্রয়োজন হবে না। অধিকাংশ তথ্য সিস্টেমে আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকবে এবং সেগুলোর বড় অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে।
অর্থাৎ, পে-ফিক্সেশনকে এমন কোনো প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কারণ নেই যেখানে কর্মচারীকে দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক তথ্য টাইপ করতে হবে।
EFT থেকে আসা তথ্য নিয়ে সতর্কতা
পে-ফিক্সেশনের সময় কর্মচারীর বিদ্যমান তথ্যের বড় একটি অংশ EFT থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে। এসব তথ্য সাধারণভাবে কর্মচারী নিজে পরিবর্তন করতে পারবেন না।
যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা কোনো তথ্যের মধ্যে ভুল থাকে বা সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টস অফিসের মাধ্যমে তা সংশোধন করতে হবে।
এ কারণে পে-ফিক্সেশন শুরু করার আগে নিজের নাম, পদ, বেতন, চাকরির তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা ভালো। তবে স্বয়ংক্রিয় তথ্য ভুল দেখালে নিজের ইচ্ছামতো সেটি পরিবর্তনের চেষ্টা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।
ষষ্ঠ ধাপেই দেখা যাবে ২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশন
পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ষষ্ঠ ট্যাব। এখানে ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ পে-ফিক্সেশনের ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এ কারণে কর্মচারীর জন্য এই ধাপটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রদর্শিত ফিক্সেশন ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হবে—নতুন মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট ধাপ এবং অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে এসেছে কি না।
এরপর সপ্তম ট্যাবে সম্পূর্ণ ফিক্সেশনের তথ্য দেখা যাবে। অর্থাৎ Final Submit করার আগে কর্মচারীর হাতে নিজের ফিক্সেশন যাচাই করার সুযোগ থাকবে।
Final Submit-এর আগে সংশোধনের সুযোগ
পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো Final Submit।
কর্মচারী নিজের পক্ষ থেকে যেসব তথ্য এন্ট্রি করবেন, Final Submit করার আগে সেগুলো প্রয়োজন হলে সংশোধন করা যাবে। তাই শেষবার Submit করার আগে পুরো তথ্য আবার যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে EFT বা সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা তথ্য নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তন করা যাবে না।
আর একবার Final Submit করে দিলে কর্মচারী নিজের পক্ষ থেকে আর তথ্য পরিবর্তন করতে পারবেন না। ফলে তাড়াহুড়ো করে Submit না করে আগে সব তথ্য মিলিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
পেনশন সংক্রান্ত তথ্যেও দিতে হবে চাকরির ইতিহাস
পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়ার শেষ দিকে পেনশন-সংক্রান্ত একটি ট্যাব থাকবে। সেখানে কর্মচারীর কর্মজীবনের তথ্য দিতে হবে।
বিশেষ করে প্রথম কর্মস্থল থেকে বর্তমান কর্মস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মস্থলের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। যেসব কর্মচারী দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন কিংবা একাধিক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, তাদের এই অংশটি পূরণ করার সময় নিজের চাকরির ইতিহাস দেখে তথ্য দেওয়া উচিত।
এই অংশে ভুল তথ্য দিলে ভবিষ্যতে চাকরির মেয়াদ বা পেনশন-সংক্রান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এই অংশটি অন্য ধাপগুলোর তুলনায় একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
রিপোর্ট দেখা ও প্রিন্ট করার সুযোগ
সব তথ্য সঠিকভাবে সম্পন্ন করার পর Report বাটনে ক্লিক করে পে-ফিক্সেশনের রিপোর্ট দেখা যাবে। প্রয়োজন হলে সেটি প্রিন্টও করা যাবে।
পরবর্তীতে অ্যাকাউন্টস অফিসের ভেরিফিকেশন-সংক্রান্ত নম্বরও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করার পর সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট সংরক্ষণ করে রাখা কর্মচারীদের জন্য উপকারী হবে।
তাহলে কর্মচারীরা কি নিজেরাই পে-ফিক্সেশন করতে পারবেন?
এই প্রশ্নটিই বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রদত্ত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে উত্তর হলো—হ্যাঁ, অধিকাংশ কর্মচারী নিজেরাই পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করতে পারবেন।
কারণ এখানে কর্মচারীর কাজ মূলত তিন ধরনের—
প্রথমত, সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা তথ্য যাচাই করা।
দ্বিতীয়ত, যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিজের তথ্য এন্ট্রি করা এবং প্রতিটি ধাপে Save & Continue করা।
তৃতীয়ত, Final Submit-এর আগে সম্পূর্ণ ফিক্সেশন যাচাই করে Submit করা।
অর্থাৎ কর্মচারীকে নিজে হাতে পুরো বেতন কাঠামোর হিসাব করতে হবে না। iBAS++-এর সিস্টেমই নির্ধারিত তথ্যের ভিত্তিতে ফিক্সেশনের ফলাফল প্রদর্শন করবে।
তবে সবাইকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে
পে-ফিক্সেশন সহজ হলেও অসতর্কভাবে করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
১. স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাই:
EFT থেকে আসা তথ্য সঠিক কি না দেখে নিতে হবে। ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টস অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
২. নিজের দেওয়া তথ্য যাচাই:
যেসব তথ্য কর্মচারী নিজে এন্ট্রি করবেন, সেগুলো Submit করার আগে ভালোভাবে মিলিয়ে নিতে হবে।
৩. Final Submit-এর আগে চূড়ান্ত যাচাই:
Submit করার পর নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ অক্টোবর থেকে কার্যক্রম শুরু
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম বিভাগে পে-ফিক্সেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন থেকেই নিজেদের প্রয়োজনীয় চাকরির তথ্য, কর্মস্থলের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রস্তুত রাখা ভালো।
বিশেষ করে যাদের একাধিক কর্মস্থল রয়েছে, তারা প্রথম কর্মস্থল থেকে বর্তমান কর্মস্থল পর্যন্ত চাকরির তথ্য আগে থেকেই যাচাই করে রাখলে পেনশন-সংক্রান্ত ট্যাব পূরণ করার সময় সুবিধা হবে।
পে-ফিক্সেশন নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
সবদিক বিবেচনায় iBAS++-এর পে-ফিক্সেশনকে অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং এটি ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি যাচাইভিত্তিক প্রক্রিয়া, যেখানে অধিকাংশ তথ্য সিস্টেমে আগে থেকেই থাকবে।
কর্মচারীকে মূলত তথ্যগুলো যাচাই করতে হবে, প্রয়োজনীয় অংশ পূরণ করতে হবে, প্রতিটি ধাপে Save & Continue করতে হবে এবং সবশেষে Final Submit করতে হবে।
তবে সহজ প্রক্রিয়া হলেও Final Submit করার আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ Submit করার পর নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে ভুল সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
iBAS++-এ পে-ফিক্সেশন জটিল নয়—সঠিক নির্দেশনা অনুসরণ করলে একজন কর্মচারী নিজেই অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। নতুন করে বিপুল তথ্য এন্ট্রি করার প্রয়োজন নেই; বরং সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করাই মূল কাজ।
তাই পে-ফিক্সেশন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে প্রত্যেক কর্মচারীর উচিত নিজের তথ্য, চাকরির ইতিহাস ও প্রয়োজনীয় নথি আগে থেকে প্রস্তুত রাখা এবং Final Submit করার আগে প্রতিটি তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা।




